আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগে গ্রেফতার ক্রিকেটার, ভারতীয় আইন কী বলছে?
- Author, প্রচেতা পাঁজা
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক ও ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিট্যালসের হয়ে খেলা পশ্চিমবঙ্গের ক্রিকেটার অভিষেক পোড়েল। ২৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারকে তিন দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে চুঁচুড়া জেলা ও মহকুমা আদালত।
এই উইকেটকিপার-ব্যাটারের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেন ডাক্তারি পড়ুয়া একজন তরুণী।
এর আগেও এই ধরনের বহু মামলায় বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কের পর ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে ভারতের বিভিন্ন আদালতের বিভিন্ন মন্তব্য রয়েছে। উভয়ের সম্মতিতে সহবাসকে ধর্ষণ বলা যায় কি না বা কোন ক্ষেত্রে তা ধর্ষণ বলে গণ্য হবে তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
ভারতের পুরোনো আইন 'ইন্ডিয়ান পেনাল কোড' বা আইপিসিতে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ধারা না থাকলেও নতুন আইন ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় তার সংস্থান রয়েছে এবং সাজাও উল্লেখ করা আছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে বিষয়টি বির্তকিত ও প্রমাণসাপেক্ষ। দেখে নেওয়া যাক, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাসের বিষয়ে ভারতের আইন কী বলে?
ক্রিকেটার অভিষেক পোড়েলের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, হুগলী জেলার মগরা থানায় ২৩শে জুন অভিযোগ দায়ের করেছিলেন একজন তরুণী। তার অভিযোগ, তিনি ও ওই ক্রিকেটার তিন বছর ধরে সম্পর্কে ছিলেন। বিয়ে করার কথাও বলেছিলেন অভিষেক পোড়েল। তারপর দুজনের মধ্যে সমস্যার সূত্রপাত হয়।
ক্রিকেটার নিজের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছেন, এমন অভিযোগ করে পুলিশের কাছে যান ওই তরুণী। পুলিশ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তিনি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
হাইকোর্টের নির্দেশে সোমবার গভীর রাতে মি. পোড়েলকে কলকাতা থেকে গ্রেফতার করা হয়। মঙ্গলবার তাকে চুঁচুড়া আদালতে পেশ করা হয়েছিল।
তার বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং তথ্য প্রযুক্তি আইনের নানা ধারায় মামলা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে তিন দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
হুগলি গ্রামীণ পুলিশ সুপার কুনওয়ার ভূষণ সিং সংবাদমাধ্যমকে বলেন, একজন তরুণী নির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেই ভিত্তিতেই পদক্ষেপ করা হয়েছে।
চুঁচুড়া আদালতের সরকারি আইনজীবী শিবাজি দাস জানান, "অভিষেক পোড়েলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন এক তরুণী। তার জামিনের আবেদন খারিজ করে তিনদিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।"
অভিষেক পোড়েলের পরিবার বা আইনজীবীর তরফে কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি তুলে রাখতেন ক্রিকেটার?
নিজেদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি নিজের মোবাইল ফোনে তুলে রাখতেন ক্রিকেটার অভিষেক পোড়েল- এমনই অভিযোগ করেছেন তরুণী। যার পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে ভারতের তথ্য প্রযুক্তি আইন, ২০০০-এ মামলা হয়েছে।
আইটি আইনের ধারা ৬৬-তে বলা আছে, কম্পিউটার বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি যদি গুরুতরভাবে আপত্তিকর, মিথ্যা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে বার্তা প্রকাশ করে, তবে তা অপরাধ।
দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, অথবা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
আইটি আইনের ধারা ৭২ অনুযায়ী, ডিজিটাল তথ্য বা ইলেকট্রনিক রেকর্ডের গোপনীয়তা রক্ষা না করে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁস করা, যা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অথবা এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, কিংবা কিছুক্ষেত্রে উভয় সাজাই হতে পারে।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় কী সাজা?
ইন্ডিয়ান পেনাল কোড বা আইপিসিতে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাসের জন্য সরাসরি কোনো আলাদা ধারা ছিল না। আইপিসির ৩৭৬ ধারায় ধর্ষণের মামলা করা হত এবং ৪১৭ ধারায় প্রতারণার আওতায় ফেলা হত।
আইনজীবি অনির্বান গুহঠাকুরতা জানান, আইপিসিতে ৩৭৬ আর ৪১৭ ধারায় এই ধরনের অভিযোগ নিয়ে মামলা করা হত। বর্তমানে নিদিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়।
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস বা ধর্ষণের অপরাধ নিয়ে কড়া শাস্তির বিধান রয়েছে ন্যায় সংহিতায়। ২০২৪ সালের পয়লা জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ফৌজদারি আইনে বলা হয়েছে পরিচয় লুকিয়ে বা ভুয়া পরিচয় দিয়ে বিয়ে, চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে যৌনতা বা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্কের অপরাধ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬৯ নম্বর ধারায় উল্লেখ রয়েছে। কেউ বিয়ে, চাকরি বা পদোন্নতির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনো নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি জরিমানার কথাও উল্লেখ আছে।
পরিচয় গোপন করে বিয়ে করলেও ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
তবে বিভিন্ন আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কেবল সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলেই সবসময় অপরাধ প্রমাণিত হবে না। প্রমাণ করতে হবে শুরুর দিন থেকেই বিয়ের প্রতিশ্রুতিটি মিথ্যা ও প্রতারণামূলক ছিল।
প্রথম থেকে প্রতারণার ইচ্ছে না থাকলে এবং পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্ক পরে ভেঙে গেলে তা সব সময় এই ধারার আওতায় নাও পড়তে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কের পর বিয়ে না-করে সম্পর্ক ভাঙলেই যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন তোলে সুপ্রিম কোর্ট৷
চলতি বছরের এপ্রিলে একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিচারপতি বিভি নাগারত্না এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার বেঞ্চ।
সম্প্রতি এলাহাবাদ হাই কোর্টও একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে দুই ব্যক্তি শারীরিক সম্পর্কে থাকার পর যদি বিয়ে না হয় তাহলে সেই সহবাসকে ধর্ষণ বলে ধরে নেওয়া যায় না। কারণ সেক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্কে দুপক্ষেরই সম্মতি থাকে।
আইনজীবী অর্নিবান গুহ ঠাকুরতা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, "সুপ্রিম কোর্টের একাধিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, যদি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বিয়ের প্রতিশ্রুতি পেয়ে সহবাসে বারবার সম্মতি দেন, তবে ধরে নেওয়া হবে যা ঘটেছে তার সম্মতিতেই ঘটেছে। তাকে ধর্ষণ বলে মানা হবে না। তা উভয়ের সম্মতিতে ঘটেছে বলেই ধরে নেওয়া হবে।"
তিনি আরও জানান, "বহু ক্ষেত্রে আমরা মামলা করতে গিয়ে দেখেছি এর ভুল প্রয়োগ হয়েছে। সম্পর্কে থাকা যুগলের মধ্যে সমস্যা তৈরি হলে অনেক সময়ই পুরুষ সঙ্গীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটা গ্রে জোন (অস্পষ্টতা) রয়েছে। গোটা বিষয়টাই আদালতে প্রমাণ সাপেক্ষ। তবে যদি ধর্ষণ প্রমাণিত হয় সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ধারায় সাজার উল্লেখ রয়েছে ভারতীয় আইনে।"