আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
হালাল শিল্প, ইসলামি অর্থনীতি, শ্রমবাজার; তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে যা যা হলো
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশ থেকে আরও শ্রমিক নিয়োগ ও দ্রুত শ্রমবাজার খুলে দেওয়া ছাড়াও দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এই সফরে বাংলাদেশ রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ বা আরসিইপি-তে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুই দেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন, অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে আবারও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া।
নয়টি বিষয়ে দুই দেশের সম্মতিতে হওয়া যৌথ বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানো, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি 'বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতি'র সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে 'হালাল শিল্পে' সহযোগিতা বাড়াতে দুই প্রধানমন্ত্রী সম্মত হয়েছেন উল্লেখ করা হয়েছে।
"আমি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ এবং একই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ করেছি। আমি অনিয়মিত (ইরেগুলার) শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ, আটক বাংলাদেশিদের দেশে পাঠানোর ইস্যুও তুলে ধরেছি," প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন।
এসময় তিনি জানান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে তারা একমত হয়েছেন যে, শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী হওয়া উচিত, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পৃক্ততা হ্রাস পায় এবং শ্রমিকদের নিয়োগ-সংক্রান্ত খরচ কমে আসে।
এর আগে সোমবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে নয়টায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় 'পেরদানা পুত্রা' ভবনে দুই নেতা একান্ত বৈঠক করেন বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং ও সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসস। দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে নেতৃত্ব দেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী ও তার স্ত্রীকে পেরদানা পুত্রা ভবনে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী ডঃ ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল।
এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে মালয়েশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল গার্ড অব অনার প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গার্ড পরিদর্শন করেন।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এটাই তার প্রথম বিদেশ সফর। আজই তিনি কুয়ালালামপুর থেকে চীনের বেইজিং যাবেন।
ওদিকে সফরের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন কুয়ালালামপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, "মাত্র ১৮ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত কিন্তু ফলপ্রসূ এই সফরে যে আলোচনা, সমঝোতা ও পারস্পারিক সহযোগিতার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, তা আগামী দিনে দুই দেশের জন্য বহুমাত্রিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে"।
তিনি জানান, সফরে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক ছাড়াও বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমনে দুটি নোট বিনিময় করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সফরে তিনি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
" বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে যৌথ কমিশন সভা এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপাক্ষিক পরামর্শ, সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছি। আমরা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বৃদ্ধি স্বাগত জানাই এবং বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি," বলেছেন মি. রহমান।
তিনি জানান, তাদের আলোচনা আইসিটি, জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য উচ্চ-মূল্যবান খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত ছিল।
বাংলাদেশ থেকে আরও শ্রমিক নিয়োগ ও যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে আহবান জানিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের, সম্ভব হলে, প্রত্যাবাসনের বিষয়েও আলোচনা করেছি। আমরা একমত হয়েছি যে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী হওয়া উচিত, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং শ্রমিকদের ব্যয় হ্রাস পায়"।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার অব্যাহত সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
"আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতাও আলোচনা করেছি। বাংলাদেশ আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। আমরা রিজিওনাল কম্প্রিহিনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)তে যোগদানের আগ্রহও প্রকাশ করেছি," বলেছেন তারেক রহমান।
তিনি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তাঁর সহধর্মিণীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান।
"আজকের আলোচনা বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আমরা অভিন্ন সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা করছি," বলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
যৌথ বিবৃতিতে যা যা গুরুত্ব পেল
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীদের একান্ত ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর দু দেশের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।
৩৩-দফার এই বিবৃতিতে রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর, শ্রম সহযোগিতা, শিক্ষা ও পর্যটন সহযোগিতা, জ্বালানি সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই নেতা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বিষয়গুলোতে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়মিত সংলাপের গুরুত্ব স্বীকার করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা যৌথ কমিশন সভা (জেসিএম) ও দ্বিপাক্ষিক কনসালটেশন দ্রুত আবার শুরু করতে সম্মত হয়েছেন।
"তারা মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এমবিএফটিএ) নিয়ে আলোচনার অগ্রগতিকে স্বাগত জানান এবং ২০২৭ সালের মধ্যে একটি পারস্পরিক লাভজনক, আধুনিক ও বিস্তৃত চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার করেন"।
"দুই প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল (জেবিসি) প্রতিষ্ঠার অগ্রগতিকে স্বাগত জানান। এটি দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতার প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে," বিবৃতিতে বলা হয়।
সফরে দুই দেশের আলোচনায় হালাল শিল্প বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, যা দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতেও উঠে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, "দুই নেতা বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতির বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা স্বীকার করেন এবং বাংলাদেশের হালাল খাতের উন্নয়নে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে সম্মত হন। তারা হালাল ইকোসিস্টেম বিষয়ে সহযোগিতা সংক্রান্ত নোট বিনিময়কে স্বাগত জানান এবং হালাল সনদ, নিয়ন্ত্রক কাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন"।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং মালয়েশিয়ার উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানের প্রশংসা করেন।
"মালয়েশিয়া বাংলাদেশের শ্রমিক নিয়োগ সংক্রান্ত প্রস্তাব বিবেচনার কথা জানায়। নতুন বিদেশি শ্রমিক কোটা অনুমোদন নিয়োগকর্তার চাহিদা ও খাতভিত্তিক সীমার ওপর নির্ভর করবে বলে উল্লেখ করা হয়। অনুমোদিত কোটার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়"।
"উভয় দেশ জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আহ্বান করতে সম্মত হয়, যা বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপদ ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক অভিবাসন নিশ্চিত করবে এবং বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করে নতুন সমঝোতা স্মারক প্রণয়নের ভিত্তি তৈরি করবে," যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়।
এছাড়া যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, দুই নেতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, ফিনটেক, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, সাইবার নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিকাশমান প্রযুক্তিতে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হন।
"মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং, টেস্টিং ও আউটসোর্সড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্ট (ওএসএটি) খাতে শক্তিশালী অবস্থান এবং বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান আইটি ও প্রকৌশল খাতকে সংযুক্ত করার বিষয়ে দুই নেতা একমত হন। বাংলাদেশ যৌথ দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির প্রস্তাব দেয়, যার মাধ্যমে প্রকৌশল স্নাতকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন করা হবে," বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত প্রায় এগার হাজার শিক্ষার্থীর অবদানের কথা উল্লেখ করে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়-টু-বিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও চুনাপাথরের মতো খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মালয়েশিয়া আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি)তে বাংলাদেশের যোগদানের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন জানায় এবং বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে দুই দেশ।