পদ্মা ব্যারাজ কী, এটি কোথায় নির্মাণ করা হবে?

ব্যারাজ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পদ্মায় ব্যারাজ নির্মাণ হলে বাংলাদেশের ২৪টি জেলার পানিসংকট নিরসন হবে বলে জানিয়েছে সরকার
    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা নদীর ওপর নতুন একটি ব্যারাজ নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। মেগা এই প্রকল্পটি আগামী সাত বছরে নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।

বুধবার ঢাকার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

'পদ্মা ব্যারাজ' নামের এই উন্নয়ন কর্মসূচির প্রাথমিক লক্ষ্য দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় পাঁচটি নদী পুনর্জীবিত করা।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীগুলোর আশপাশের ২৪টি জেলার পানিসংকট নিরসন হবে, যার ফলে প্রায় সাত কোটি মানুষ উপকৃত হবে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।

ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে শুষ্ক মৌসুমে ওই অঞ্চলে ব্যাপক খরা পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং পদ্মা নদীর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য নদী শুকিয়ে যায়। এর ফলে নদী তীরবর্তী এলাকায় লবণাক্ততা দেখা দেয়।

অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতাও তৈরি হয় বলে জানান মন্ত্রী।

"সবদিক বিবেচনায় এই প্রকল্পটিকে আমরা বলছি যে মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প, যেটা আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, ইশতেহারে ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নির্বাচনের পূর্বে রাজশাহীতে গিয়ে জনসাধারণের সামনে সেটা বক্তব্য রেখেছিলেন, কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার) করেছিলেন। সেটা বাস্তবায়নের জন্য এই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়েছে," বুধবার একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের বলেন মি. এ্যানি।

আগামী অর্থবছরেই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

২০৩৩ সালের মধ্যে ব্যারাজ নির্মাণ শেষে ওই অঞ্চলে তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী।

কিন্তু ব্যারাজ জিনিসটা আসলে কী? এটি কখন এবং কেন নির্মাণ করা হয়?

একনেক সভা

ছবির উৎস, BD PMO

ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় বুধবার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়

ব্যারাজ কী?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ব্যারাজ হলো পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে নদী বা জলাধারের ওপর আড়াআড়িভাবে নির্মিত বিশেষ একটি অবকাঠামো।

ড্যাম বা বাঁধের সঙ্গে এর বড় পার্থক্যের জায়গা হলো বাঁধের মাধ্যমে জলাধারের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে পানি ধরে রাখা হয়।

অন্যদিকে, ব্যারাজের মাধ্যমে পানির প্রবাহ বন্ধ করার পরিবর্তে সেটির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এক্ষেত্রে মূল অবকাঠামোতে একাধিক দরজা রাখা হয়, যেখান দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়।

সাধারণত ব্যারাজ নির্মাণের আগে সেটার উজানে এক বা একাধিক কৃত্রিম খাল খনন করা হয়। এরপর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ওইসব খালে পানি ঢোকানো হয়। সেই পানি পাম্পের মাধ্যমে কৃষি জমিতে সেচ আকারে দেওয়া হয়।

আবার অনেক সময় ব্যারাজের মাধ্যমে এক নদীর পানি অন্য নদীতে নিয়ে সেটির প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে সেটিই করার পরিকল্পনা করছেন কর্মকর্তারা।

"যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে যেখানে ব্যারাজ প্রয়োজন, সেখানে যদি এটি নির্মাণ করা যায় এবং ঠিকঠাকমত কাজে লাগানো যায়, তাহলে অনেক ধরনের সুবিধা পাওয়া সম্ভব," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আনিসুল হক।

আবার এর ব্যত্যয় ঘটলে হিতে বিপরীতও হতে পারে বলে জানাচ্ছেন এই বিশেষজ্ঞ।

"তখন দেখা যাবে ব্যারাজ কোনো কাজে লাগছে না, বরং শুধু শুধু অর্থের অপচর হয়েছে এবং নদীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কাজেই ব্যারাজ নির্মাণের আগে ভালোমত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নির্মাণের পর সেটির ঠিকঠাক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি," বলেন করেন অধ্যাপক হক।

বাংলাদেশে আগেও বিভিন্ন সময় নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ করতে দেখা গেছে।

এর মধ্যে ১৯৮৩ সালে মৌলভীবাজারে মনু নদীর ওপর প্রথমবার একটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছিল, যেটি মনু ব্যারাজ নামে পরিচিত।

পরে ১৯৯০ সালে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর ওপর তিস্তা ব্যারেজ এবং ঠাকুরগাঁওয়ের টাঙ্গন নদীর ওপর টাঙ্গন ব্যারেজ তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশে আগেও তিনটি ব্যারাজ তৈরি হয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে আগেও তিনটি ব্যারাজ তৈরি হয়েছে

পদ্মায় ব্যারাজ কেন?

২০২৬ সালে এসে সরকার পদ্মা নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পেলেও বিষয়টি নিয়ে আগেও বিভিন্ন সরকারের সময় আলোচনা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত অন্তত চার দশকে ব্যারাজের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছিল।

এমনকি, বিএনপি সরকারের গত মেয়াদে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়।

এরপর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্থানীয় ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের একটি দল সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দেয়।

২০১৬ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নে কাজ করে।

বিশেষজ্ঞরা সমীক্ষা শেষে যে প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিয়েছিল, সেখানে বলা হয়, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে উজানে পানি প্রত্যাহার বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

এর ফলে নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষি ও মৎস্য খাতে যেমন বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি নৌ চলাচল ও জীববৈচিত্র্যও বাধার মুখে পড়ছে।

এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গত নির্বাচনের আগে পদ্মায় ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান। ক্ষমতায় এসে সেটিই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজে শতাধিক গেইট বা দরজা আছে
ছবির ক্যাপশান, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজে শতাধিক গেইট বা দরজা আছে, যেগুলো দিয়ে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়

কোথায় হবে পদ্মা ব্যারাজ?

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতায় মূল অবকাঠামোটি নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়।

প্রায় দুই দশমিক এক কিলোমিটার দীর্ঘ ওই ব্যারাজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দু'টি ফিশ পাস বা নিরাপদে মাছ চলাচলের জায়গা রাখা হবে।

ব্যারাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত যে কাঠামোর মাধ্যমে নদীর অতিরিক্ত পানি বাইরে বের করে দেওয়া হয়, সেটাই হলো স্পিলওয়ে।

আর আন্ডার স্লুইস হলো ব্যারেজের পানির প্রবাহ ও পলি ব্যবস্থাপনার জন্য নির্মিত আরেকটি বিশেষ কাঠামো।

এই ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করার আশা করছেন কর্মকর্তারা। সংরক্ষিত ওই পানি বণ্টনের জন্য তিনটি 'অফটেক অবকাঠামো' নির্মাণ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

যে নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়, সেটির পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টনের জন্য যে বিশেষ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়ে থাকে, সেটি 'অফটেক অবকাঠামো' নামে পরিচিত।

একইসঙ্গে, প্রথম ধাপের কর্মকাণ্ডের আওতায় গড়াই-মধুমতী নদীতে ১৩৫ দশমিক ছয় কিলোমিটার এবং হিসনা নদীতে ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন এবং ড্রেজিং কাজ করা হবে।

দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।

ফারাক্কা ব্যারাজ

ছবির উৎস, FBP

ছবির ক্যাপশান, ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে তিস্তা নদীর পানির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে ভারত

কী কাজে লাগবে?

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার।

এক্ষেত্রে ব্যারাজের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ওইসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।

এরপর সেই পানি দিয়ে যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পিরোজপুর অঞ্চলে প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ দেওয়া হবে বলে প্রকল্পের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেটি সম্ভব হলে দেশে আরও প্রায় ২৪ লাখ টন ধান এবং সোয়া দুই লাখ টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে দাবি করেছেন কর্মকর্তারা।

একইসঙ্গে, নদী তীরবর্তী এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

"বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল, সেদিকের মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকার পাবে...এই পদ্মা ব্যারাজ করার মাধ্যমে সর্বোচ্চ বেনিফিটটা আমরা ওই অঞ্চলের মানুষকে দিতে পারবো, সেটা কৃষিখাতে হোক, সুন্দরবনের জন্য হোক," বুধবার সাংবাদিকদের বলেন মি. এ্যানি।

২০৩৩ সালের পর দ্বিতীয় ধাপে ব্যারেজ ঘিরে তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এছাড়া সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।

প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, নদীগুলোতে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কমবে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা পাবে এবং সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হবে।

এ ছাড়া গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প, উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প, গোদাগাড়ী পাম্প হাউস এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সবমিলিয়ে এই প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার আর্থ-সামাজিক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সরকারের কর্মকর্তারা।