আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত 'ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম' সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে?
- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সম্প্রতি ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ছয় জন তরুণকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা সবাই 'ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম' (এফসিএস) নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যাচ্ছে।
সংগঠনটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা শরীরচর্চা ও মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের নামে বিভিন্ন জেলায় উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।
স্থানীয়ভাবে উপকরণ সংগ্রহ করে তারা বোমা তৈরির চেষ্টা করছিলো বলেও দাবি করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্ত সংগঠনটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের যোগাযোগ বা অর্থ আদান-প্রদান ছিল কি-না, সেটাই এখন খতিয়ে দেখছে সিটিটিসি।
জিজ্ঞাসাবাদে এফসিএসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবির অভিযোগ স্বীকার করেছেন বলে দাবি পুলিশের।
"উগ্রবাদী মতাদর্শের পক্ষে সমর্থন থেকেই যে তারা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো এবং সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, সাবির সেটা স্বীকার করেছেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সিটিটিসি'র ওই কর্মকর্তা।
অভিযোগের বিষয়ে মি. সাবির বা তার পরিবারের কারো কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে গ্রেফতার হওয়ার মাসখানেক আগে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। যেখানে অভিযোগ অস্বীকার করে মি. সাবির দাবি করেন, দেশি-বিদেশে কোনো উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
গ্রেফতারকৃতদের আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বুধবার দ্বিতীয় দফায় সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। পরে শুনানি শেষে মি. সাবির ও তার সহযোগী হোসাইন তানিমকে তিন দিনের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেয় আদালত।
বাকি চার তরুণকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, যাদের মধ্যে আতাউল্লাহ শাহ নামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন নেতাও রয়েছেন। যদিও গ্রেফতারের খবর জানার পর গাজীপুর নগর আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব পদে থাকা মি. শাহকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে এনসিপি।
যাত্রা শুরু ছয় মাস আগে
ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম সংগঠনটির তথ্যমতে, তাদের যাত্রা শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে। এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবির। নিজ জেলা খুলনা থেকে তিনি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু করেন।
অনলাইনে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের একটি ওয়েবসাইট দেখা যাচ্ছে। সেখানে যোগাযোগের ঠিকানা হিসেবে খুলনার ময়লাপোতা এলাকার ফরাজীপাড়ার লেনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমেও বেশ সক্রিয় ছিল সংগঠনটি।
ফেসবুকে তাদের একটি গ্রুপ এবং একটি পেইজ রয়েছে। মূলত সেখানেই নিজেদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের তথ্য, ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
তারপরও কোনো কারণে যদি গ্রুপ ও পেইজটি বন্ধ হয়ে যায়, সেজন্য ওই গুলোর প্রতিটির একটি করে ব্যাকআপ বা বিকল্প গ্রুপ ও পেইজও খুলে রাখা হয়েছে। ওয়েবসাইটেও সেগুলোর লিংক দেওয়া হয়েছে।
এর বাইরে, ইউটিউব ও টেলিগ্রামে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের নিজস্ব চ্যানেল রয়েছে।
ডিজিটাল এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শুরু থেকেই প্রশিক্ষণের জন্য সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে আসছে সংগঠনটি।
এক্ষেত্রে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে সংগঠনটি বলছে, তারা "বিশ্বের প্রথম শিরকমুক্ত, কুফরমুক্ত, মিউজিকমুক্ত এবং পরিপূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী মার্শাল আর্ট" প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
"আমাদের লক্ষ্য কেবল একজন দক্ষ প্রশিক্ষণার্থী তৈরি করা নয়; বরং এমন আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল মুসলিম গড়ে তোলা, যিনি প্রয়োজনে শরিয়াহর নির্দেশনা মেনে নিজের, পরিবারের এবং নিরপরাধ মানুষের আত্মরক্ষা করতে সক্ষম," ফেসবুকে পেইজের পোস্টে উল্লেখ করেছে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম।
গত ২০শে জুন সংগঠনটির ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে সংগঠন বলছে, "এটা শুধু শারীরিক প্রশিক্ষণ নয়। এটা আত্মরক্ষা, শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা এবং ঈমানি শক্তি দৃঢ় করার একটি প্ল্যাটফর্ম।"
ঢাকায় গ্রেফতার যেভাবে
খুলনা থেকে শুরু করলেও গত ছয় মাসে সংগঠনটির কার্যক্রম যশোর এবং ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে যশোরের সদর এবং অভয়নগর উপজেলায় তাদের তিনটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে বলে ফেসবুকে পেইজে উল্লেখ করা হয়েছে।
যদিও পুলিশ বলছে, খুলনার বাইরে তারা বিভিন্ন নির্জন খোলা জায়গায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি সপ্তাহের শুরুতে ঢাকায় রমনা পার্কে এ ধরনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজনের চেষ্টা করে সংগঠনটি।
কিন্তু শেষপর্যন্ত সেটাতে সফল না হয়ে পরে যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া এলাকার একটি মাঠে প্রশিক্ষণের স্থান নির্ধারণ করে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম।
গত পাঁচই জুলাই ভোরে প্রশিক্ষণ শুরু সময় সেখান থেকে প্রশিক্ষকসহ ছয়জন তরুণকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
"আমাদের কাছে তথ্য ছিল যে, তারা ওইদিন ভোরে বালুর মাঠে প্রশিক্ষণ শুরু করছে। খবর পেয়ে আমরা সেখানে পৌঁছালে তারা পালানোর চেষ্টা করলেও আমরা ধরে ফেলি," বলেন যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের পরিদর্শক এবি সিদ্দিক।
কে এই সাবির?
শাহ আমানত সাবির নামের যে ব্যক্তির হাত ধরে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের যাত্রা শুরু, তার বয়স ২৩ বছর। ওই তরুণের জন্মস্থান ও বসবাস খুলনায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মি. সাবিরের ফেসবুক প্রোফাইলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি পড়াশোনা করেছেন খুলনায়। তবে ঠিক কোন শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, সেই তথ্য দেওয়া হয়নি।
ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে মি. সাবির জানান, বছর আটেক আগে মার্শাল আর্টের ওপর তিনি প্রশিক্ষণ শেষ করেন।
এরপর ন্যাশনাল স্কুল অব ব্যুত্থান মার্শাল আর্টের খুলনা শাখায় প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় সাত বছর সেখানে তিনি কাজ করেন।
পরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর চাকরিটি ছেড়ে দেন বলে জানান মি. সাবির।
দ্বন্দ্বের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফেসবুকের ওই ভিডিওতে তিনি বলেন, "আমরা মুসলিম হিসেবে মিউজিককে হারাম মনে করি। এ বিষয়ে ফেডারেশনের সঙ্গে ঝামেলা হওয়ায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি ব্যুত্থান থেকে অফিসিয়ালি রিজাইন করি।"
এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম (এফসিএস) প্রতিষ্ঠা করেন মি. সাবির। প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি পরিচয় করিয়ে দেন 'শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' হিসেবে।
"এটি এমন একটি মার্শাল আর্ট স্টাইল যেখানে হারাম মিউজিক ব্যবহার হয় না। মার্শাল আর্টের মাথা ঝুকিয়ে সম্মান করার রীতি এখানে বাদ দেওয়া হয়েছে, যেহেতু একজন মুসলিম শুধুমাত্র আল্লাহ-তায়ালার সামনেই মাথা ঝোকাবে," ভিডিওতে বলেন মি. সাবির।
তিনিই প্রতিষ্ঠানটির মূল প্রশিক্ষক। তবে তার বেশ কয়েকজন সহযোগী রয়েছেন, যারা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচলায় সহায়তা করে থাকেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এছাড়া স্ত্রীকেও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন জানিয়ে শিগগিরই মুসলিম নারীদের জন্যও মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করবেন বলে গত মে মাসে জানান মি. সাবির।
পুলিশের অভিযোগ
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের তথ্যে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম দাবি করছে যে, তারা 'শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি মার্শাল আর্ট' প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে, যার মূল উদ্দেশ্য আত্মরক্ষা।
কিন্তু পুলিশ বলছে, প্রতিষ্ঠানটি মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের উগ্রপন্থি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে এফসিএসের যোগাযোগ রয়েছে, এমনকি টাকা নিয়ে তাদের পক্ষে সদস্য সংগ্রহ এবং অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পেয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।
প্রাথমিক তদন্তে উগ্রপন্থি মতাদর্শের পক্ষে জনসমর্থন তৈরির ব্যাপারে কিছু তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার কথা বলছেন তারা।
"মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে তারা মূলত সাধারণ তরুণদের উগ্রবাদী মতাদর্শের পক্ষে আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল ধীরে ধীরে সংগঠিত হওয়া এবং শক্তি সঞ্চয় করা," বলেন কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা।
স্থানীয়ভাবে উপকরণ সংগ্রহ করে তারা বোমা তৈরির চেষ্টা করছিল বলেও দাবি করেছে পুলিশ।
"বোমা তৈরির পর পরীক্ষামূলকভাবে সেটি বিস্ফোরণ করা হচ্ছে-এমন একটা ভিডিও আমরা পেয়েছি," বিবিসি বাংলাকে বলে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সিটিটিসি কর্মকর্তা।
জিজ্ঞাসাবাদে 'পটকার বারুদ' দিয়ে হাত বোমা এবং পেট্রোল দিয়ে 'পেট্রোল বোমা' বানানোর চেষ্টার কথা তারা স্বীকার করেছে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
তবে বিদেশি উগ্রপন্থি কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে এফসিএসের যোগাযোগ ছিল কি-না, বা তাদের হয়ে সদস্য সংগ্রহ করছিল কি-না, সেটি এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি কর্মকর্তারা।
"এসব অভিযোগের বিষয়ে আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। তদন্ত শেষ হলেই বিষয়টা পরিষ্কার হওয়া যাবে," বলেন ওই কর্মকর্তা।
গত ছয় মাসে ঠিক কত সংখ্যক মানুষকে সংগঠনটি প্রশিক্ষণ দিয়েছে, সেটার সঠিক কোনো তথ্য নেই পুলিশের কাছে।
ফাতাহ কমব্যাটও এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করেনি। তাছাড়া ঢাকায় ছয়জন গ্রেফতার হওয়ার পর যশোর ও খুলনার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে কেন্দ্রগুলোর নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে গ্রেফতার হওয়ার আগে উগ্রপন্থার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ফাতাহ কমব্যাটের প্রতিষ্ঠাতা।
গত মে মাসের শেষের দিকে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে প্রকাশিত ভিডিওতে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবির দাবি করেন, দেশি-বিদেশে কোনো উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই।
অর্থ নিয়ে বিদেশি সংগঠনের পক্ষে সদস্য সংগ্রহ বা অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে না বলেও দাবি করেন মি. সাবির।
প্রশিক্ষণের ভর্তি ফি দিয়েই নিজেরা কার্যক্রম চালান বলে জানান তিনি।
তার মুক্তি চেয়ে ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও কমেন্টে থানা ঘেরাওসহ নানান হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
"কিন্তু আমরা এসব হুমকিতে ভিত নই। বরং যারা এসব হুমকি-ধামকি দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবো," বলেন ডিএমপি'র কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তা।