টেলিগ্রাম নিষিদ্ধে বিপাকে ইরানের মানুষ

ইরানে প্রায় চার কোটি মানুষ টেলিগ্রাম অ্যাপটি ব্যবহার করেন
ছবির ক্যাপশান, ইরানে প্রায় চার কোটি মানুষ টেলিগ্রাম অ্যাপটি ব্যবহার করেন
Published

ইরানের বাসিন্দাদের কাছে খুব জনপ্রিয় একটি অ্যাপ্লিকেশন টেলিগ্রাম, যা দেশটির অন্তত চার কোটি মানুষ ব্যবহার করে।

কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ঘোষণা করে সম্প্রতি সেই অ্যাপের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। ফলে এই অ্যাপের ওপর নির্ভরশীল মানুষজনকে যেমন বিপদে ফেলেছে, তেমনি উদারপন্থীদের হতাশ করে তুলেছে।

টেলিগ্রাম অ্যাপটি ইরানিয়ানদের কাছে শুধুমাত্র একটি বার্তা পাঠানোর অ্যাপ নয়, এটা যেন আলাদা একটা জগত। সেখানে ইরানের অর্ধেক মানুষই বিচরণ করেন।

ইরানি প্রেসিডেন্টের মতো অনেকে এটি গণযোগাযোগের জন্য ব্যবহার করেন, আবার আলী রেজার মতো অনেকের রুজিরোজগার এর ওপর নির্ভর করে, যিনি এর ওপর নির্ভর করে সংসার চালান।

আলী রেজা বলছেন, ''আমি টেলিগ্রামের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ইচ্ছুকদের কাছে শিক্ষা ভিডিও ক্লিপগুলো বিক্রি করি। আমার রোজগার ভালোই, দরকারি সব খরচ হয়ে যায়। টেলিগ্রাম ব্লক হয়ে থাকায় আমি সংকটেই পড়েছি।''

টেলিগ্রাম ইরানে অনেকের যোগাযোগ আর আর্থিক আয়েরও উৎস
ছবির ক্যাপশান, টেলিগ্রাম ইরানে অনেকের যোগাযোগ আর আর্থিক আয়েরও উৎস

টেলিগ্রামের হিসাবে, প্রায় চার কোটি ইরানিয়ান টেলিগ্রাম অ্যাপটি ব্যবহার করে। যাদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের রক্ষণশীল সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও।

টেলিগ্রামের ওপর যদিও এই নিষেধাজ্ঞা আসার বিষয়টি আগে থেকেই আঁচ করা হচ্ছিল, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত অনেকে ইরানিয়ানকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তাদের একজন মেহতাদ। তিনি বলছেন, সিদ্ধান্তটি তার ব্যবসায় যেন পেরেক ঠুকে দিয়েছে।

মেহতাদ বলছেন, ''টেলিগ্রামের মাধ্যমে আমার ব্যবসায়ের নতুন পণ্য আসার ঘোষণা দিতাম। এমনকি সশরীরে না গিয়ে এটি ব্যবহার করে আমি অনেক কেনাকাটাও করতে পারতাম। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার পর এর কিছুই আমি করতে পারছি না।''

টেলিগ্রাম তার গ্রাহকদের গোপনীয়তা রক্ষার সুযোগ দেয়, যার ফলে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেখানে নজরদারি করতে পারেনা। যে কারণে ইরানে এই অ্যাপটির এতো জনপ্রিয়তা। আর এ কারণেই টেলিগ্রামের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা।

ইরানের বিচার বিভাগ বলছে, এই অ্যাপটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

গত জানুয়ারিতে ইরানের অন্তত আশিটি শহর জুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানেও যোগাযোগ, ছবি আর ভিডিও আদানপ্রদানে টেলিগ্রাম অ্যাপটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল
ছবির ক্যাপশান, গত জানুয়ারিতে ইরানের অন্তত আশিটি শহর জুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানেও যোগাযোগ, ছবি আর ভিডিও আদানপ্রদানে টেলিগ্রাম অ্যাপটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল

গত জানুয়ারিতে ইরানের অন্তত আশিটি শহর জুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানেও যোগাযোগ, ছবি আর ভিডিও আদানপ্রদানে টেলিগ্রাম অ্যাপটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

গ্রাহকদের তথ্য দিয়ে টেলিগ্রাম প্রতিষ্ঠাতাদের সহযোগিতার জন্য অনুরোধ করেছিল ইরানের কর্মকর্তারা, কিন্তু তারা তাতে রাজি হয়নি। এরই জের ধরে আসল এই নিষেধাজ্ঞাটি।

ইরানের নিষিদ্ধ অ্যাপের তালিকায় আরো রয়েছে টুইটার, ফেসবুক আর ইউটিউবও। নেটওয়ার্কিং বিশেষজ্ঞ সিয়ামাইক আরাম বলছেন, এখন ইরানের বেশিরভাগ মানুষ শিখে নিয়েছে, কিভাবে এসব নিষেধাজ্ঞা এড়াতে হয়।

তিনি বলছেন, ''গত কয়েক বছর ধরে ইরানের মানুষজন অনেক ধরণের প্রক্সি ওয়েবসাইট আর সফটওয়্যার ব্যবহার শিখে নিয়েছে, যাতে তারা এসব নিষেধাজ্ঞা এড়িয়েই এসব অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষ করে জানুয়ারির বিক্ষোভের পর প্রক্সির ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। এমনকি যারা প্রযুক্তি সম্পর্কে ভালো জানে না, তারাও এখন শিখে গেছে, কিভাবে এগুলো ব্যবহার করতে হয়।''

অনেক প্রযুক্তি পণ্য ইরানে নিষিদ্ধ থাকায় সেখানকার বাসিন্দারা বিকল্প পথে ব্যবহার শিখছেন
ছবির ক্যাপশান, অনেক প্রযুক্তি পণ্য ইরানে নিষিদ্ধ থাকায় সেখানকার বাসিন্দারা বিকল্প পথে ব্যবহার শিখছেন

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, এখন ইরানে এসব অ্যাপ বন্ধ করতে হলে পুরো ইন্টারনেটই বন্ধ করে দিতে হবে, যা বাস্তবসম্মত নয়।

জরুশ নামের ইরানি একটি অ্যাপ ব্যবহারের জন্য উৎসাহ দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ, কিন্তু ইরানের মানুষজনের সেই অ্যাপে বিশ্বাস নেই।

টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ করার এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিও, যদিও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি শক্ত কোন ব্যবস্থা নেননি।

ফলে টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা দেশটির রক্ষণশীলদের খুশি করেছে আর যারা উদারতার আশায় মি. রুহানিকে ভোট দিয়েছিলেন, তাদের আরেক দফা হতাশ করেছে।