ভবিষ্যৎ শহরগুলোতে শব্দ দূষণ ঠেকাতে কিভাবে লড়াই করবেন স্থপতিরা?

কায়রো
ছবির ক্যাপশান, মারাত্মক শব্দ দূষণের শিকার বিশ্বের দশটি বড় শহরের একটি কায়রো-ভবিষ্যতের জন্য কিভাবে ভবন নির্মাণ করবেন।
Published

যখনই শহুরে পরিবেশ এবং দূষণ নিয়ে আপনি ভাবেন, তখন কি সাথে সাথে শব্দ দূষণের নেতিবাচক বিষয়গুলোর কথা ভাবেন?

অধিকাংশ মানুষ (তাদের মধ্যে নগর পরিকল্পনাবিদরাও আছেন)- তাদের শহরকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনার মধ্যে দূষণ বলতে স্থান দেন গাড়ির ধোঁয়া, ধোঁয়াশা, জমে থাকা নোংরা কাদা-পানি, যেখানে সেখানে ফেলা আবর্জনা আর প্লাস্টিক ইত্যাদি জঞ্জালের স্তূপকে।

কিন্তু বিজ্ঞান এটা প্রমাণ করেছে, শব্দ দূষণ কম গুরুত্বপূর্ণ কোন হুমকি নয়। এতদিন এই দূষণকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া না হলেও এখন এটাকে বড় হুমকি হিসাবে বিবেচনার সময় এসেছে।

কারণ শব্দ দূষণ মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত, হৃদরোগ, কাজের মানের অবনতি, স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য লেখাপড়ার সমস্যা, এমনকি শ্রবণশক্তি পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে।

"মানুষকে একদিন শব্দ-দূষণের মোকাবেলা করতে হবে কলেরা এবং কীটপতঙ্গ ঠেকানোর মত সমান গুরুত্বের সঙ্গে," বলেছেন নোবেলজয়ী চিকিৎসক রবার্ট কোচ, যক্ষ্মা বিষয়ে যুগান্তকারী অবদানের জন্য ১৯১০ সালে যিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

কিন্তু শব্দের বিরুদ্ধে লড়াই কিভাবে শুরু করবেন?

বার্সেলোনার একটি রেস্তোরায় লোকজন খাবার খাচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, ইউরোপের কোলাহলপূর্ণ শহর বার্সেলোনাতে একটি নীরব শান্ত এলাকা খুঁজে বের করা রীতিমত কঠিন কাজ।

'দারুণ অনুভূতিময়' শহর তৈরি

কেমন সে শহর? এক্ষেত্রে স্থাপত্যবিদ্যা কি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন তারা কাজটা পারেন।

ইংল্যান্ডের সলফোর্ড ইউনিভার্সিটির শব্দ বিষয়ক প্রকৌশলী ট্রেভর কক্স যেমনটা বলেছেন যে, "অর‍্যাল (Aural) আর্কিটেকচার হচ্ছে এমন একটি বিষয় যেখানে গুরুত্বপূর্ণ হল ভবনগুলো কি বলতে চাইছে, ভবনগুলোর ভেতর কিধরনের শব্দ তৈরি হচ্ছে, আমরা কীভাবে তাতে সাড়া দিচ্ছি সেগুলো।

এই ভবনগুলো মানুষ এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে সেটা বোঝা।

সর্বাধুনিক শব্দ প্রযুক্তি এবং নতুন ধরনের নির্মাণ উপকরণ কেবলমাত্র উন্নত নতুন শহর তৈরি করতে শুধু সহায়তা করবে তা নয়, বরং পুরনো ধাঁচের শহরগুলোরও মান উন্নয়ন করবে।

এসব প্রযুক্তি দিয়ে বর্তমান ভবনগুলো তারা এমনভাবে বদলে দিতে পারেন যে ভবনের বাইরেটা অবাঞ্ছিত বাইরের শব্দগুলো ঠেকিয়ে রাখবে। সুনির্দিষ্ট শব্দ তরঙ্গ আর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য তৈরি করে অবাঞ্ছিত শব্দকে ভবনের ভেতরে ঢুকতে দেয়া হবে না।

সাউন্ড আর্টিস্ট মাইকেল ফাওলার উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন, "ভবিষ্যতে বিমানবন্দরের খুব কাছে বাস করা হয়তো সম্ভব হবে। আপনি যে মুহূর্তে ভবনের কয়েক মিটারের মধ্যে পৌঁছবেন, সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরের সব শব্দ উধাও হয়ে যাবে এই প্রযুক্তির কল্যাণে।''

একটি ঐতিহ্যবাহী তাতামি রুম থেকে জাপানি বাগানের দৃশ্য।
ছবির ক্যাপশান, একটি ঐতিহ্যবাহী তাতামি রুম থেকে জাপানি বাগানের দৃশ্য।

'খালি জায়গাকে নয়নাভিরাম' করে তোলা

মিস্টার ফাওলার জার্মানিতে টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব বার্লিনের অডিও কমিউনিকেশন গ্রুপের একজন সদস্য এবং অর‍্যাল আর্কিটেকচার নিয়ে তার অনন্য অবদান রয়েছে।

ফাঁকা জায়গাকে শব্দ দিয়ে সুন্দর করে সাজানোর ব্যাপারে তিনি খুব আগ্রহী। যেমন, জাপানি ধাঁচে বাগান তৈরি- যেখানে থাকবে শুকনো পাথুরে ঝর্না যা সত্যিকারের ঝর্ণার মত প্রবাহিত হবে। বুদ্ধি খরচ করে চোখের আড়ালে পানির উৎস বসালে তা বিশেষ একটা দৃশ্যপট তৈরি করবে।

তিনি বলেন, স্থপতিরা ভবন নির্মাণের সময় বা জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গায় এধরনের ফিচার বসানোর নক্সা দিতে পারেন যা সবার জন্য একটা দূষণ মুক্ত সুন্দর শব্দময় পরিবেশ তৈরি করবে।

চীনের গুয়াংঝু বিশ্বের সবচেয়ে কোলাহলপূর্ণ শহর
ছবির ক্যাপশান, চীনের গুয়াংঝু বিশ্বের সবচেয়ে কোলাহলপূর্ণ শহর

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শব্দ-দূষণের শিকার কোন্ কোন্ শহর?

বিশ্ব-স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা বলছে বিশ্বজুড়ে শব্দ-দূষণ একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা, এবং শত কোটি মানুষ বসবাস করে এমন সব এলাকায় যেখানে শব্দের তীব্রতা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

এই গবেষণা অনুসারে চীনের গুয়াংঝু শহর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শব্দ দূষণের শহর। অন্যদিকে সবচেয়ে কম শব্দ দূষণ সুইজারল্যান্ডের জুরিখে।

সবচেয়ে খারাপ মাত্রার শব্দ দূষণের তালিকায় বিশ্বের যে দশটি শহর রয়েছে তার মধ্যে এশিয়ায় গুয়াংঝুর পরেই আছে- দিল্লি, মুম্বাই এবং বেইজিং। আফ্রিকায় কায়রো, ইউরোপের শহরগুলোর মধ্যে ইস্তানবুল, বার্সেলোনা এবং প্যারিস এবং লাতিন আমেরিকাতে মেক্সিকো সিটি এবং বুয়েনস আয়ার্স।

রাস্তার সুরেলা কোলাহল

যেখানে শহুরে কোলাহল থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়, সেখানে যানবাহনের শব্দকে কি সুরেলা করে তোলা সম্ভব?

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের আরএমআইটি ইউনিভার্সিটির গবেষক জর্ডান ল্যাসি এমনটাই করেছেন ২০১৬ সালে। তিনি শব্দ বদলের একটি অভিনব সরঞ্জাম তৈরি করেছেন।

তিনি একটি পার্কের পাশের রাস্তার কোলাহল, যানবাহনের তীব্র আওয়াজ মাইক্রোফোনে রেকর্ড করে তার সঙ্গে মিশিয়েছেন সঙ্গীতের মূর্চ্ছনা। তারপর সেই সুরেলা শব্দ তিনি লাউডস্পিকারের মাধ্যমে পার্ক এলাকায় বাজাচ্ছেন। ফলে আগে যারা শব্দের অত্যাচারে ঘরের দরোজা বন্ধ করে রাখতেন বারান্দায় বেরতেন না,এখন সেইসব বাসিন্দারা তাদের বারান্দায় নিশ্চিন্তে বসছেন।

ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়ার গবেষকরাও বিশেষ আকারের জানালা তৈরি করেছেন যা চারপাশ থেকে আসা শব্দকে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে ধরবে এবং বাড়ির মালিক তার ঘরের ভেতর পছন্দের সঙ্গীত তার সঙ্গে মিশিয়ে একটা নতুন শব্দরাজ্য তৈরি করতে পারবেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ার্স দক্ষিণ আমেরিকার একটি কোলাহলপূর্ণ শহর।
ছবির ক্যাপশান, আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ার্স দক্ষিণ আমেরিকার একটি কোলাহলপূর্ণ শহর।

শব্দ কোলাহল থেকে বিরতি?

তাহলে, কোলাহলপূর্ণ শব্দকে বিরক্তি উদ্রেককারী পর্যায় থেকে আনন্দদায়ক করে তোলা যেতে পারে, কিন্তু শব্দের অত্যাচার থেকে একেবারে পালানো কি সম্ভব?

স্থপতিরা আগামী দিনের শহরগুলো পরিকল্পনা করছেন এমনভাবে যাতে একটা শান্ত এবং প্রাকৃতিক শব্দ সম্বলিত শহর গড়ে তোলা যায়।

জর্ডান লেসি বলেন, "শহরের কোলাহল সম্পর্কে অভিযোগ করা সহজ, বলা সহজ যে আরও নিবিড়ভাবে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা উচিত। কিন্তু যে সমস্ত লোকের এর কাছাকাছি আসারও সুযোগ নেই তারা কী করবে?"

তিনি মনে করেন সেসব জায়গায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করে তার সাথে প্রযুক্তির মিশ্রণ ঘটিয়ে শহরে একটা শান্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। যার উদ্দেশ্য হবে প্রকৃতির কাছে তাদের নিয়ে যাওয়া নয়, বরং শহরের আবহে তাদের শব্দ থেকে পালানোর সুযোগ করে দেয়া।

একটি পার্কের ভেতর শান্ত পরিবেশ এবং পানির ফোয়ারা
ছবির ক্যাপশান, একটি পার্কের ভেতর শান্ত পরিবেশ

ফ্লোর-প্ল্যান এবং ভবনের কথা 'শোনা'

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সিস্টেম এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। স্থপতিরা বুঝতে শুরু করেছেন তাদের নকশা করা ফাঁকা জায়গা কীধরনের শব্দ তৈরি করতে পারে।

এই প্রক্রিয়াকে বলে 'অর‍্যালাইজেশন'। এটা হল ফাঁকা জায়গার মধ্যে এমনভাবে শব্দ বা ধ্বনি তৈরি করা যা আপনাকে কোন বিশেষ পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দেবে।

বাইরের শব্দকে প্রযুক্তির মাধ্যমে এমনভাবে কৃত্রিমভাবে তৈরি শব্দের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে যা মানুষের জন্য একটা সুখের বা আনন্দের অনুভূতি তৈরি করবে। ভবনের নক্সা তৈরির কাজে বড় ভূমিকা রাখবে শব্দ সৃষ্টি বা শব্দ বিন্যাসের বিষয়।

জার্মানির হামবুর্গে এলবফিলহারমোনি কনসার্ট হল
ছবির ক্যাপশান, জার্মানির হামবুর্গে এলবফিলহারমোনি কনসার্ট হল

ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম অরুপ এর কনসাল্ট্যান্ট নাওমি টেনেসি বলেন, স্থপতিরা ভবিষ্যতে তাদের নক্সার মধ্যে ধ্বনি শোনার ওপর জোর দেবেন এবং সে অনুযায়ী কোথায় উন্নতি দরকার সেটা বুঝতে পারবেন।

মিস্টার ফাওলার বলছেন, ''আমরা যদি ধ্বনি সপর্কে আরও সচেতন হয়ে উঠি, বিষয়টা নিয়ে আরও কাজ করি, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা আমাদের শহরকে, আমাদের বাসাবাড়িকে, আমাদের অফিসকে চোখ ও কানের জন্য নান্দনিক করে তুলতে পারব আর সেই সাথে শব্দ দূষণের সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে পারব।