তুরস্কের অভিযানে আইএস সদস্যদের পাহারা দেয়া সিরিয়ার কুর্দিদের অগ্রাধিকার নয়

তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ১ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ১ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে তুরস্কের বাহিনীর হামলার শিকার কুর্দিরা বলছে, এই অভিযান চলতে থাকলে ইসলামিক স্টেটের বন্দিদের পাহারা দেয়ার বিষয়টিতে তারা আর গুরুত্ব দেবে না।

কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) হাতে বর্তমানে হাজার হাজার সন্দেহভাজন আইএস সদস্য বন্দি।

উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার যেসব এলাকা এসডিএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেসব এলাকায় বুধবার তুরস্ক অভিযান শুরু করার পর থেকে তীব্র বোমা হামলার শিকার হয়েছে।

এখন পর্যন্ত সীমান্তের দুই পাশে ৫০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post

তুরস্ক কুর্দিদের সন্ত্রাসী বলে দাবি করে এবং তাদের হটিয়ে সিরিয়ার সীমান্তের অভ্যন্তরে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত তাদের ভাষায় 'নিরাপদ অঞ্চল' তৈরি করতে চায়।

এছাড়া বর্তমানে তুরস্কের অভ্যন্তরে থাকা ৩০ লাখের বেশি সিরিয়ান শরণার্থীকেও সিরিয়ার ভেতরে ঐ অঞ্চলে ফেরত পাঠাতে চায় তুরস্ক।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য ভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, একজন নারী কুর্দি রাজনীতিবিদ এবং নারী অধিকার কর্মী শনিবার উত্তর সিরিয়ায় নিহত হয়েছেন।

ফিউচার সিরিয়া পার্টি নামের রাজনৈতিক দলের ঐ নেতার গাড়ি থামিয়ে তার গাড়িচালক ও সহযোগীসহ তুরস্কের সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেছে তার দল।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, কুর্দি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে এরই মধ্যে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তবে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার কুর্দি প্রশাসন বলছে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ লাখের কাছাকাছি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঐ অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দেয়ার পর কার্যত এসডিএফ-এর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে উদ্যোগী হয় তুরস্ক। আইএস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে পশ্চিমা জোটের সবচেয়ে বড় সহযোগী ছিল এসডিএফ।

শুক্রবার কুর্দি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর করা একটি গাড়ি বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, শুক্রবার কুর্দি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর করা একটি গাড়ি বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস

কুর্দিদের বক্তব্য:

তুরস্কের সাথে সংযুক্ত সিরিয়ার সীমান্তে তুরস্কের সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে মনোনিবেশ করতে গিয়ে আটক থাকা আইএস বন্দিদের দিকে নজর রাখার বিষয়টি বিঘ্নিত হচ্ছে বলে টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, রেদুর জেলিল নামের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা।

"আইএস বন্দিদের পাহারা দেয়া এখন আর অগ্রাধিকার নয়। এই বন্দীদের আটক থাকা নিয়ে যারা চিন্তিত, তারা এসে পাহারা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত।"

মি. জেলিল বলেছেন, আইএস বন্দিদের পাহারা দেয়ার বদলে এসডিএফ'এর সেনারা 'আমাদের শহর এবং আমাদের জনগণ' বাঁচানোর জন্য কাজ করবে।

তিনি এমনও সতর্ক করেছেন যে তুরস্কের অভিযান আইএস'কে পুনরায় জোট বাধার সুযোগ করে দিচ্ছে।

"কামিশলি এবং হাসাকেহ অঞ্চলে এরই মধ্যে আইএস পুনরায় সক্রিয় হয়েছে এবং তাদের শাখার কার্যক্রম শুরু করেছে।"

আইএস সিরিয়ায় কী করছে:

কামিশলি এবং হাসাকেহ শহরে দুইটি গাড়ি বোমা বিস্ফোরণের পর কুর্দিদের পক্ষ থেকে এরকম মন্তব্য এলো। ঐ দু'টি গাড়ি বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস।

শুক্রবার তুরস্কের হামলা চলাকালীন কামিশলির একটি কারাগার থেকে পাঁচজন আইএস সদস্যও পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় বলে এসডিএফ জানিয়েছে।

আরো পড়তে পারেন:

সিরিয়ার কোন এলাকা এখন কার নিয়ন্ত্রণে
ছবির ক্যাপশান, সিরিয়ার কোন এলাকা এখন কার নিয়ন্ত্রণে

ওদিকে, শনিবার সিরিয়ায় নতুন অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে আইএস।

তারা বলেছে, কুর্দি নিয়ন্ত্রিত কারাগারে আইএস-এর সদস্যদের বন্দি রাখার প্রতিশোধ নিতে তারা এই নতুন অভিযান শুরু করবে।

এসডিএফ বলেছে তারা সাতটি কারাগারে ১২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন আইএস জঙ্গিকে আটকে রেখেছে এবং তাদের মধ্যে অন্তত চার হাজার বিদেশি নাগরিক।

এই বন্দীদের অবস্থান প্রকাশ না করা হলেও বলা হচ্ছে তাদের অনেকের অবস্থান তুরস্কের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে।

রোজ এবং আইন ইসা নামের দু'টি ক্যাম্পে - যেগুলো তুরস্কের ভাষায় 'নিরাপদ অঞ্চলের' মধ্যে রয়েছে - সন্দেহভাজন আইএস জঙ্গিদের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছে।

শুক্রবার কুর্দি নেতৃত্বাধীন প্রশাসন জানিয়েছে যে বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ আইন ইসা ক্যাম্পটিকে সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

সীমান্তের দুইদিকেই নিহত হয়েছেন অনেক বেসামরিক নাগরিক

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, সীমান্তের দুইদিকেই নিহত হয়েছেন অনেক বেসামরিক নাগরিক

তুরস্ক জানিয়েছে, চলমান এই অভিযানের ফলে পালাতে সক্ষম হওয়া আইএস বন্দিদের খুঁজে পেলে তাদের দায়িত্ব নেবে তারা।

অভিযানের অগ্রগতি হচ্ছে কীভাবে?

অন্যতম প্রধান সীমান্তবর্তী শহর রাস আল-আইনের নিয়ন্ত্রণ দখলকে কেন্দ্র করে শনিবার সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে।

তুরস্ক জানায় তাদের সেনাবাহিনী এবং সিরিয়ান বিদ্রোহীদের জোট ঐ শহরের প্রধান কেন্দ্র দখল করেছে, কিন্তু কুর্দি নেতৃ্ত্বাধীন এসডিএফ বাহিনী ঐ শহরের দখল হারানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

তুরস্কের অভিযানের অন্যতম প্রধান দু'টি লক্ষ্যবস্তু হলো রাস আল-আইন এবং তাল আবইয়াদ শহর।

তুরস্কের মিত্র বাহিনীরা দাবি করছে তারা সীমান্ত থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাসহ এক ডজনেরও বেশি গ্রাম দখল করেছে।

তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তের ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি এলাকায় তুরস্কের ক্রমাগত বিমান এবং স্থল হামলার শিকার হচ্ছে এসডিএফ।

এসডিএফ কর্মকর্তা রেদুর জেলিল শনিবার তার বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কুর্দি যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানায়। ঐ বিবৃতিতে বিশেষ কয়েকটি এলাকায় তুরস্কের বিমান উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করার বিষয়টিকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে দাবি জানায় তারা।

এখন পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা

বুধবার থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। সীমান্তের দুই পাশেই বেসামরিক নাগরিক মারা গেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

অন্তত ৩৮ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ৮০ জন কুর্দি যোদ্ধা মারা গেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস।

তুরস্ক থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, দক্ষিণ তুরস্কে ১৭ জন বেসামরিক নাগরিক মারা গেছেন।

তুরস্কের সমর্থক বিদ্রোহী বাহিনীর - যারা সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি হিসেবে পরিচিত - প্রায় ৫০ জন যোদ্ধা মারা গেছেন।

শনিবার অনেক ইউরোপিয়ান শহরের মত বার্লিনেও বিক্ষোভ করে মানুষ

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, শনিবার অনেক ইউরোপিয়ান শহরের মত বার্লিনেও বিক্ষোভ করে মানুষ

এই অভিযানের প্রতিক্রিয়া:

এই অভিযান থামানোর জন্য তুরস্কের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়েপ এরদোয়ান জানিয়েছেন যে এই অভিযান চলবে।

শনিবার, ফ্রান্স বলেছে যে, তারা তুরস্কে সব ধরণের অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করবে। এর আগেই জার্মানি ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা নেটো জোটের কাছে অস্ত্র বিক্রি সীমিত করবে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে টেলিফোন করে সতর্ক করেছেন যে, তাঁর এই অভিযানের ফলে সিরিয়ায় আইএস-এর বিপক্ষে অর্জিত 'উন্নতি খর্ব হতে পারে।'

কুর্দিরা এরই মধ্যে তাদের অবস্থান পরিস্কার করেছে। তারা বলছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের ফলে তারা প্রতারিত বোধ করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন বলছেন যে, তার ইচ্ছা যুক্তরাষ্ট্র যেন তুরস্ক ও কুর্দিদের মধ্যে সমঝোতার মধ্যস্থতা করে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে প্রয়োজন হলে তুরস্কের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও জারি করতে প্রস্তুত তিনি।

ওদিকে শনিবার প্যারিস, বার্লিনসহ ইউরোপের অনেক শহরে হাজার হাজার মানুষ তুরস্কের এই অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশ করে পদযাত্রায় অংশ নেয়।