সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড হওয়া বাংলাদেশি নারী কারাগার থেকেই যোগাযোগ রাখতেন, দাবি পরিবারের

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড হওয়া নারী পরিবারের দুই জন সদস্যের ছবি যেখানে তাদের মুখ ঘোলাটে করে দেওয়া হয়েছে
ছবির ক্যাপশান, ওই নারী কারাগারে থাকার কথা জানলেও তার মৃত্যুদণ্ড হবে এরকম কোনো তথ্য জানতেন না বলে জানান পরিবারের সদস্যরা
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিবন্ধিত রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি নারী। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তিনি সৌদি আরবের কারাগারে থাকার কথা তারা জানতেন।

এরইমধ্যে, বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই নাগরিকের পরিচয় সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছে।

সৌদি আরবে যেতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো তাদের যে পরিচয়পত্র দিয়েছিল, তা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সাংবাদিকদের সরবরাহ করেছে।

সেই তথ্য অনুযায়ী, ওই নারীর বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বিবিসি বাংলাকে জানান, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই নারীর বাড়ি এবং বাবার নাম-পরিচয় সম্পর্কে তিনি মঙ্গলবারই জানতে পেরেছেন।তবে, এখন পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অথবা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি তিনি।

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীর টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়ি
ছবির ক্যাপশান, পরিবারের সদস্যরা জানান, আর্থিক অনটন দূর করতে চাকরি খোঁজে সৌদি আরবে যান ওই নারী

সৌদি কারাগার থেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ

বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তথ্য বলছে, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক চাকরির জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মধ্যপ্রাচ্যের ওই দেশটিতে যান।

সরকারি নিবন্ধিত রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মাধ্যমে যারা সরকারি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সৌদি আরব কিংবা দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের জন্য যান তাদের পরিচয়পত্র দিয়ে থাকে বাংলাদেশের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো।

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া এই দুইজনেরও আইডি কার্ড রয়েছে।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মে মাসে ওই নারীর পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে। সৌদি আরব যেতে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয় তাকে।

সরকারি লোগো সংবলিত এই কার্ডটিতে বলা হয়েছে, কার্ডধারী ব্যক্তি ইন্সুরেন্স কাভারেজ এবং ওয়েলফেয়ার সার্ভিস পাবেন।

নিহত এই নারীর পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত বুধবারই তার মৃত্যুদণ্ডের কথা জানতে পারেন তারা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বোনের মৃত্যুদণ্ডের কথা জানতে পারেন বলে জানান তার বড় বোন।

তিনি জানান, পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিল সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই নারী।

"বুধবার দিনই খবর শুনছি। হের বান্ধবী আমারে ফোন দিয়া বললো, আপু কথা শুনো নাই। বলছি যে না। তখন সে ভিডিও কইরা পাঠাইছে। তখন দেখি যে, ফেসবুকেও ছাইড়া দিছে" বলেন নিহত নারীর বড় বোন।

সৌদি আরব থেকে নিয়মিতই তার বোন যোগাযোগ করতেন এবং কারাগারে থাকার কথাও পরিবারকে জানিয়েছিল।

তবে, ঠিক কী কারণ বা কোন অপরাধে সৌদি আরবের কারাগারে রয়েছেন সেই বিষয়টি ওই নারী জানাননি বলে দাবি করছেন পরিবারের সদস্যরা।

তার বড় বোন বলেন, "একবার বলছিলো, আমরা এক রুমে অনেক মেয়েরা আছিলাম। তারা গাড়ি কিনছিল, এটার অভিযোগে তাদের মালিক সবাইকে ধরাইয়া দিছিল, এইটুকু সে বলছে। কিন্তু পরবর্তীতে কি হইছে আর কিছু বলে নাই।"

এমনকি পরিবারের সদস্যদের এ ব্যাপারে আর কিছু জিজ্ঞেস করতেও নিষেধ করেছিলেন তিনি।

একইসঙ্গে, দেশে এসে এ বিষয়ে সবাইকে জানানোর কথা বলেছিলেন বলেও জানান তিনি।

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবে যাওয়ার ছয় মাস পরেই ওই নারীর কারাগারে যাওয়ার কথা জানতে পারে পরিবার।

তার বড় বোন বলছিলেন, সৌদি আরব যাওয়ার পর প্রথমদিকে নিয়মিত যোগাযোগ করলেও মাস ছয়েক পরে তার কোনো খোঁজ-খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে সেখানকারই আরেকজনের কাছে বোনের কারাগারে থাকার খবর পান।

নিহত নারীর বোন জানান, "মক্কা শরিফের ভেতরে পরিষ্কার করার কাজের জন্য গেছে বলছিল।"

তার বাবা জানান, পাঁচ বছর আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দুই বছর সংসার করার পর তার ডিভোর্স হয়ে যায়। এরপরে ২০২৩ সালে কাজ নিয়ে সৌদি আরব চলে যান তিনি।

ওই স্বামীর ঘরে কোনো সন্তান না থাকায় নিজের বোনের মেয়েকে তিনি লালন-পালন করছিলেন বলে জানান ওই নারীর বাবা।

তিনি আরো জানান, সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয়মাস নিয়মিতভাবেই টাকা পাঠাতেন তার মেয়ে, কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পরে টাকা পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশি যে পুরুষের সঙ্গে তারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তার সম্পর্কে ওই নারী কখনোই পরিবারকে কিছু জানাননি বলে দাবি করেন তারা।

ওই নারীর বোনের মেয়ে বিবিসি বাংলাকে জানান, গত সপ্তাহের বুধবার সৌদি আরবের কারাগার থেকেই ফোন করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেদিন টেলিফোন লাইনে সমস্যা থাকার কারণে কথা বলা যায়নি।

এমনিতে এক মাস বা ১৫ দিন পরপর কারাগার থেকে ফোন করে কথা বলতেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই নারী।

এর আগে, মঙ্গলবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সবশেষ কথা বলেন তিনি। তবে সেদিনও পরিবারের সদস্যরা জানতেন না তার মৃত্যুদণ্ডের কথা।

"বুধবার কথা বলতে পারি নাই। মঙ্গলবারেও ফোন দিছিল। তার যদি মৃত্যুদণ্ড হইতো, তাহলে তো সে বলতো, আমি ভালো নেই, আমার মৃত্যুদণ্ড হইছে," বলেন ওই নারীর ভাগ্নি।

সৌদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য দাঁড়িয়ে আছেন। প্রতীকী ছবি

প্রশাসন যা বলছে

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই নারীর বাড়ি ও পরিবার সম্পর্কে মির্জাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঙ্গলবার সকালে অবহিত করেছেন জেলা প্রশাসক আবু সাঈদকে।

তবে, এখনো তারা ওই নারীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি বলে জানান তিনি।

গত বুধবার বাংলাদেশি এক নারী ও এক পুরুষের মৃত্যুদণ্ডের খবর সৌদি আরবের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশ কিংবা সৌদি আরবের সরকার রোববার পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি।

পাঁচদিন পর সোমবার রাতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে দুইজনের পরিচয় প্রকাশ করে।

এদিকে, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই নারীর মরদেহ আনার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ।