তেল, দুধ, চিনি থেকে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক আপনার শরীরে ঢুকছে?

মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে দুধ, চিনি এবং সয়াবিন তেলেও

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে দুধ, চিনি এবং সয়াবিন তেলেও
    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৭ মিনিট

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা থাকার বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই বাংলাদেশে এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এবার দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও অধিক মাত্রায় এই উপাদানের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা।

নিত্যদিনের খাদ্য তালিকায় থাকা পণ্যেও অধিক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

এসব গবেষণা তথ্য সামনে আসার পর, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে গেলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে? একজন মানুষ নিয়মিত কী পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছেন, প্রতিকারের উপায় কী- এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই।

গবেষকরা বলছেন, কেবল সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি প্লাস্টিক কণা বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করছেন।

শিশুদের ক্ষেত্রে এই অবস্থা আরও খারাপ বলেই মত গবেষকদের। তারা বলছেন, একজন শিশু প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে।

খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক আসার তিনটি পথ নির্ধারণ করেছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট এবং বস্তা থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাবারে অধিক হারে মিশছে।

এছাড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় কারখানার মেশিন, পাইপ, কনভেয়ার বেল্ট ক্ষয়ে গিয়েও কণা তৈরি হচ্ছে। আর পরিবেশ দূষণের কারণে প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়ে পানি, মাটি ও বাতাসে মিশছে।

গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার অর্ধেকের বেশিই সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা হয় না। সেই বর্জ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়ে খাদ্যচক্রে ঢুকছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা এবং সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি দেশি-বিদেশি নানা গবেষণায় উঠে আসলেও, কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের ফলে শরীরের কোন অঙ্গে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, এর বিস্তারিত গবেষণা এখনও হয়নি।

তবে ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো সরাসরি রক্তেও মিশে যেতে পারে বলে মনে করেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। যার ফলে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রদাহ ও কোষের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে বলে মত তাদের।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি বা ইউএনইপি- এর বাস্তুতন্ত্র বিভাগের পরিচালক সুসান গার্ডনার বলছেন, পণ্যগুলোকে এমনভাবে নতুন করে ডিজাইন করা, যাতে সেগুলোতে প্লাস্টিকের পরিমাণ ও প্লাস্টিক ফাইবার কম থাকে এবং ব্যবহারের শেষে তা পরিবেশে নির্গত না হয়।

বিভিন্ন পণ্য পরিবহন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধের পরামর্শও দিচ্ছেন তিনি।

বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করেছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করেছে

দুধ, চিনি ও তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে প্রচলিত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল। যেখানে ১৯টি ব্রান্ডের ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতেই মিলেছে প্লাস্টিক কণা।

এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেই পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক।

এই তথ্য পাওয়ার পর অনেকেই বেশ নড়েচড়ে বসেছেন। সামাজিক মাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

এমন প্রেক্ষাপটেই এবার দুধ, চিনি এবং সয়াবিন তেলের মধ্যেও প্লাস্টিক কণা পাওয়ার দাবি করেছেন গবেষকরা। পৃথক তিনটি গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাঁচা দুধ ও সুপারশপের প্রক্রিয়াজাতকরণ দুধ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক এর নেতৃত্বে একটি গবেষক দল।

গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ মিলিলিটার প্রসেসড দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি এবং কাঁচা দুধে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি কণা পাওয়া গেছে।

অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলছেন, খামার থেকে দুধ সংগ্রহের পর প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পাইপে পরিবহন, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ, কর্মীদের প্লাস্টিকের গ্লাভস এবং সবশেষে প্লাস্টিকের বোতল বা প্যাকেটে সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপেই প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে দুধ।

গবেষণাগারে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখা যায়, প্রাপ্ত কণাগুলোর অধিকাংশ ছিল স্বচ্ছ এবং আঁশের মতো তন্তু আকৃতির। দুধে শনাক্ত হয়েছে পিটিএফই বা টেফলন, পিইটি, নাইলন-৬, পিভিসহ একাধিক ক্ষতিকর পলিমার।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের খাদ্যে দুধের নির্ভরতা বেশি। ফলে তাদের দেহে এই প্লাস্টিক কণা প্রবেশের হারও সর্বাধিক।

শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের নিরাপদ বা ক্ষতিকর মাত্রা এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি নির্ধারিত নয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের নিরাপদ বা ক্ষতিকর মাত্রা এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি নির্ধারিত নয়

অন্যদিকে, জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন এন্ড অ্যানালিসিস নামের আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা খোলা এবং প্যাকেটজাত সাত ধরনের চিনি পরীক্ষা করেছেন একদল গবেষক।

যেখানে, ব্রান্ডেড চিনির প্রতি কেজিতে গড়ে কমবেশি ৩২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা এবং খোলা চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ৪০৩টি কণা পাওয়া গেছে।

গবেষকরা বলছেন, পরিসংখ্যানগত দিক দিয়ে পার্থক্য খুব বেশি না হলেও খোলা চিনিতে দূষণ তুলনামূলক বেশি। শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর আকার ১২ মাইক্রোমিটার থেকে তিন দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত।

প্লাস্টিকের বস্তা, প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি, পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় পরিবেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টিকই এর মূল উৎস বলে মত গবেষকদের।

সয়াবিন তেল পরীক্ষায় উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের যৌথ গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন এন্ড অ্যানালিসিস জার্নাল -এ প্রকাশ হয়েছে।

গবেষকরা ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করেন।

যেখানে, খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার এবং বোতলজাত তেলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার থেকে ৫৪ হাজারটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও গবেষণা দলের প্রধান ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলছেন, শিল্পকারখানার আধিক্য, টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক কারখানার কাছাকাছি অবস্থান এবং খোলা তেল সংরক্ষণে পাত্রের বারবার ব্যবহারের কারণে এমনটা হচ্ছে।

"মাইক্রোপ্লাস্টিকের যে মাত্রা পাওয়া গেছে সেটি ভয়াবহ। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন এবং কীভাবে এটি কমানো যায় তাও ভাবা দরকার," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

পরিবেশ দূষণের ফলে খাদ্যচক্রে ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের পরিমাণ বাড়ছে বলে মত গবেষকদের

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পরিবেশ দূষণের ফলে খাদ্যচক্রে ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের পরিমাণ বাড়ছে বলে মত গবেষকদের

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের এমন যে-কোনো কণা, যার প্রস্থ এক ন্যানোমিটার থেকে পাঁচ মিলিমিটারের মধ্যে।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি বা ইউএনইপি- এর বাস্তুতন্ত্র বিভাগের পরিচালক সুসান গার্ডনার এর মতে, এর দুটি প্রধান উৎস রয়েছে। কিছু প্লাস্টিক ছোট করে তৈরি করা হয়- যেগুলো প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত, যেটি ফেস ওয়াশ এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ করা হয়।

কিন্তু বেশিরভাগ মাইক্রোপ্লাস্টিক আসে বড়ো আকারের প্লাস্টিক পণ্য পচনের ফলে, যার মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের মোড়ক, টেকঅ্যাওয়ে কন্টেইনার, পলিয়েস্টারের পোশাক, টায়ার, রঙ এবং কৃত্রিম ঘাস। এগুলো সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত।

ইউএনইপি এর তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে কেবল ২০২০ সালেই প্রায় ২৭ লক্ষ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে মিশেছিল। ধারণা করা হচ্ছে যে, ২০৪০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে।

ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পণ্য- যেমন পানির বোতল ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হতে পারে। পলিয়েস্টারের মতো সিন্থেটিক কাপড় ধোয়ার সময়ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের আঁশ ঝরে পড়তে পারে।

এছাড়া, মানুষ যখন এই কণা মিশ্রিত পণ্য ব্যবহার করে, তখনও মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে নির্গত হয়। পানি, মাটি এবং বাতাসেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায় বলে দাবি ইউএনইপি এর।

২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তাদের অবস্থান এবং কার্যকলাপের উপর নির্ভর করে বছরে গড়ে ৩৯ হাজার থেকে ৫২ হাজার পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন।

মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে সেটি নিয়ে নানা গবেষণা চলছে

ছবির উৎস, Emmanuel Lafont

ছবির ক্যাপশান, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে সেটি নিয়ে নানা গবেষণা চলছে

স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব কতটা?

অতি মাত্রায় প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারের এই যুগে এর দূষণের মাত্রাও অত্যাধিক। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় খাদ্যপণ্যে এমনকি বাতাসেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে এর প্রভাব তাৎক্ষণিক নয়।

২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, পৃথিবীতে ১৯৯০ সাল থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ার পরিমাণ ছয়গুণ বেড়েছে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কিছু অংশসহ বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে।

কিন্তু এগুলো মানবদেহে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে তা খুঁজে বের করা বেশ কঠিন বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

২০২৫ সালের শুরুর দিকে, এ নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের গবেষক স্টেফানি রাইট।

এই গবেষক বলছেন, প্লাস্টিকের সীলযুক্ত টি-ব্যাগ গরম জলে ডোবানো কিংবা প্লাস্টিকের পাত্রে তরল পদার্থ মাইক্রোওয়েভে গরম করা- এমন নানা প্রক্রিয়ায় প্রতিদিনই মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করছে।

"আমরা জানি যে প্লাস্টিক গ্রহণের ক্ষেত্রে হিটিং এবং গরম জল সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি, এবং এটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের জিনিসপত্র থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গমনকে ত্বরান্বিত করতে পারে," বলেন স্টেফানি রাইট।

তার অনুমান, যে ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক রক্তপ্রবাহে পৌঁছায়, সেগুলো হলো ক্ষুদ্রতর কণা। কিন্তু প্রাণী এবং টেস্ট টিউবের উপর বিভিন্ন গবেষণা সত্ত্বেও, "মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটা নির্দিষ্ট মাত্রা একজন সাধারণ সুস্থ ব্যক্তিকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, সে সম্পর্কে আমাদের কাছে প্রায় কোনো তথ্যই নেই।"

২০২৪ সালের শেষের দিকে, চীনের একজন গবেষক কনুই, কোমর বা কাঁধের জয়েন্ট প্রতিস্থাপন সার্জারি করানো একদল রোগীর হাড় এবং কঙ্কাল পেশির নমুনার মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক আবিষ্কার করেন।

ওই বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণাপত্রে, ইতালির একদল গবেষক প্রাথমিক পর্যায়ের হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্যারোটিড ধমনীতে (মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী একজোড়া প্রধান নালি) মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেন।

এরপর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বিজ্ঞানীদের আরেকটি দল মানবদেহের মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছিলেন।

এই গবেষণার নেতৃত্বদানকারী নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন বলেন, যাদের মৃত্যুর আগে ডিমেনশিয়া ধরা পড়েছিল, তাদের মস্তিষ্কে, এই রোগে আক্রান্ত নন, এমন ব্যক্তিদের তুলনায় ১০ গুণ বেশি প্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছিল।

প্লাস্টিক বর্জ্য কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্লাস্টিক বর্জ্য কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

সরকার ও বিএসটিআই যা বলছে

বাংলাদেশে বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার পর এ নিয়ে সরকার এবং মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, এমন প্রশ্নও উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্কিত না হতে এবং গুজবে কান না দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআই।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো ব্রান্ড বা পণ্যকে অনিরাপদ বলা সঠিক হবে না।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির বিষয়ে ইতোমধ্যে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ তথ্য, পরীক্ষাপদ্ধতিসহ নানা তথ্য চাওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে বিএসটিআই।

এছাড়া উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও কাঁচামাল, পণ্যের উপাদানসহ নানা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টুথপেস্টে অনিচ্ছাকৃতভাবে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য সীমা এখনও নির্ধারণ করেনি বলেও দাবি প্রতিষ্ঠানটির।

তারা বলছে, শুধু কণা পাওয়া গেলেই যে কোনো প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করে ব্যবহার করেছে এটি বলার সুযোগ নেই।

বিএসটিআই বলছে, কোনো পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে বাজার ও কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে।

যদি কোনো পণ্য বাংলাদেশে মান পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ নিয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও। তিনি বলছেন, বিষয়টিকে শুধু একটি পণ্যের সমস্যা হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।

"সরকার এই জননিরাপত্তার ব্যাপারটা খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এটা শুধু টুথপেস্ট না, এটা একটা বিরাট ব্যাধির মতো ছড়িয়েছে। খাবারে, পানিতে ছড়িয়েছে। একটা সমন্বিত পদক্ষেপ লাগবে," বলেন মি. রহমান।