সাগরে ৩৬ দিন ধরে ভেসে থাকা শ্রীলঙ্কান বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করল বাংলাদেশি জেলেরা

তাদের মাছ ধরার ট্রলারটি এখন পুলিশের হেফাজতে রয়েছে

ছবির উৎস, MD ABDUS SULTAN

ছবির ক্যাপশান, তাদের মাছ ধরার ট্রলারটি এখন পুলিশের হেফাজতে রয়েছে
    • Author, মুকিমুল আহসান
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন বাবা-ছেলেসহ চারজন শ্রীলঙ্কান নাগরিক। হঠাৎই বিকল হয়ে যায় তাদের মাছ ধরার ট্রলার। সেখান থেকে দুইজন অন্য ট্রলারে ফিরে গেলেও বিকল সেই মাছ ধরার ট্রলারটি রক্ষা করতে সেটি ছেড়ে যাননি বাবা ও ছেলে।

টানা ৩৬দিন শ্রীলঙ্কান সেই মাছ ধরার ট্রলারটি সমুদ্রে ভাসতে থাকার পর গত বুধবার বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ট্রলারটিকে দেখতে পায় বাংলাদেশি একটি মাছ ধরা ট্রলার।

ওই ট্রলারটি কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের জিয়াউর রহমানের। তিনিসহ ওই ট্রলারটিতে মোট আটজন জেলে ছিলেন।

জিয়াউর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান, গত বুধবার রাতে তিনি ওই ট্রলারটিকে দূর থেকে ভাসতে দেখছিলেন। একটু একটু করে যখন কাছে যান তখন তিনি দেখতে পান ট্রলারটিতে দুইজন ভিনদেশি নাগরিক।

"কাছে গিয়ে দেখলাম দুইজন মানুষ বসা থেকে উঠতে পর্যন্ত পারতেছে না। তাদের কোন কথাই বুঝতেছিলাম না। তারা হাতের ইশারায় সাহায্য চাচ্ছিল। আর শুধু বলছিলো- শ্রীলঙ্কান, শ্রীলঙ্কান"।

মি. রহমান বলছিলেন, পরে তাদেরকে সেখান থেকে তাদের মাছ ধরার ট্রলারের করে উপকূলে নিয়ে আসেন তিনি।

শ্রীলঙ্কার ওই দুই নাগরিক হলেন এস এইচ চামিন্দা ও তাঁর ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং। তাঁদের বাড়ি শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার রুরাল হসপিটাল রোডে।

সমুদ্রে ভাসতে থাকা ওই দুইজন শ্রীলঙ্কান জেলে, তাদের পরিবার এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সাথেও কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।

সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং এর মেয়ে শ্রীলঙ্কা থেকে বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন উদ্ধারকৃত ও দুইজন নাগরিক সম্পর্কে তার বাবা ও দাদা। তার এ জন্য বাংলাদেশের জেলে ও পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান।

বর্তমানে ওই দুইজন জেলে কক্সবাজারেই আছেন। আর তাদের বিকল মাছ ধরার সেই ট্রলারটিও রাখা হয়েছে পুলিশি হেফাজতে। তাদেরকে শিগগিরই ঢাকায় পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কক্সবাজার মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি মো. আবদুস সুলতান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, এ নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনার তার সাথে কথা বলেছেন। ওই দুইজন জেলেকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে এরই মধ্যে প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।

ওই দুইজন শ্রীলঙ্কান নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নিতে এরই মধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে অ্যাম্বাসির মাধ্যমে

ছবির উৎস, MD ABDUS SULTAN

ছবির ক্যাপশান, ওই দুইজন শ্রীলঙ্কান নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নিতে এরই মধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে অ্যাম্বাসির মাধ্যমে

ভাসতে থাকা ট্রলারটি যেভাবে উদ্ধার

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে প্রায় ১৩শ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে শ্রীলঙ্কার অবস্থান। দক্ষিণ এশিয়ার কাছাকাছি দেশ দুটির অবস্থান হলেও সরাসরি জলসীমা নেই দুটি দেশের মধ্যে।

মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান বঙ্গোপসাগরে তার ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে বের হয়েছিলেন।

তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, গত বুধবার বঙ্গোপসাগরের গুলিরধার এলাকায় একটি মাছ ধরার ট্রলারকে সাগরে ভাসতে দেখে সেই ট্রলারটির কাছাকাছি যান। কাছে গিয়ে তিনি দেখেন ট্রলারটির ইঞ্জিন বিকল। সেখানেই অসুস্থ অবস্থায় বসে আছেন দুই ব্যক্তি।

মি. রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "কাছে গিয়ে দেখি ওই দুইজন মানুষ বসা থেকে উঠতে পারছিলেন না। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম তারা কোথা থেকে আসছে। তারা জানালো, তারা শ্রীলঙ্কার। এর বাইরে তাদের আর কোন ভাষা আমরা বুঝিনি।

তিনি জানান, ওই দুইজন জেলে তাদেরকে সাহায্যের আকুতি জানান। এক পর্যায়ে ওই দুইজনকে তাদের ট্রলারে উঠিয়ে আনেন তিনি ও তার ট্রলারে থাকা অন্য জেলেরা।

"তাদের কোন ভাষাই আমরা বুঝতেছিলাম না। তারা শুধু বার বার দুইটি শব্দ বলছিলো, নেভি? কোস্টগার্ড", যোগ করেন তিনি।

জেলে জিয়াউর রহমানের ভাষ্য, শ্রীলঙ্কান ওই দুই জেলে তাদের মাছ ধরার ট্রলারটি হাতছাড়া করতে চাচ্ছিল না। যে কারণে ওই দুইজন জেলেকে তাদের ট্রলারে ওঠানোর পর তাদের মাছ ধরার ট্রলারের সাথে বেঁধেই উপকূলের উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি।

এরপর প্রায় ১৪ ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে ওই দুইজন শ্রীলঙ্কান জেলেকে সাথে নিয়ে উপকূলে পৌছাতে বৃহস্পতিবার সকাল হয়ে যায় বলেও জানান মি. রহমান।

সাগরে উদ্ধার হওয়া দুইজন শ্রীলঙ্কান নাগরিক এস এইচ চামিন্দা ও তাঁর ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং

ছবির উৎস, ZIAUR RAHMAN

ছবির ক্যাপশান, সাগরে উদ্ধার হওয়া দুইজন শ্রীলঙ্কান নাগরিক এস এইচ চামিন্দা ও তাঁর ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং

তারপর কী হলো?

উদ্ধার হওয়া ওই দুই জেলের বরাত দিয়ে ট্রলার মালিক জিয়াউর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান, সাগরে ভেসে থাকার একপর্যায়ে যখন তাদের খাবার শেষ হয়ে গিয়েছিল, ওই দুই শ্রীলঙ্কান নাগরিক সাগরের কাঁচা মাছ খেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ট্রলারে ওঠার পর ওই দুইজনকে বিস্কুট পানিসহ কিছু খাবার দেওয়া হলে সেগুলো খান তারা। একটা পর্যায়ে দুই জন তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগও করতে চান।

ট্রলার মালিক জিয়াউর রহমান জানান, ওই দুই জেলেকে নিয়ে বাংলাদেশি ট্রলারটি উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছায়। একটা পর্যায়ে যখন মোবাইলে ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের আওতায় আসে তখন ওই দুই জেলে শ্রীলঙ্কায় থাকা তাদের পরিবারের একটি ফোন নম্বর দেন তার কাছে।

সেই নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেওয়ার পর বাবা-ছেলে ওই দুইজন জেলে তাদের পরিবারের সাথে কথা বলেন এবং পরিবারের সাথে কথা বলে তারা আশ্বস্তও হন।

মি. রহমান বলেন, "এরপর আমরা বিষয়টি স্থানীয় থানা ও কোস্টগার্ডকেও জানাই। পরে ওই দুইজন জেলেকে সাথে করে আমার বাসায় নিয়ে যাই। বাসায় নিয়ে তাদেরকে রাতের খাবার-দাবার দেই। স্থানীয় ডাক্তার ডেকে ডাক্তার দেখাই। ডাক্তার তাদের ওষুধ দেয় সেই ওষুধ তারা খায়"।

ওই রাতে জিয়াউর রহমানের বাসায় থাকা অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন রাতে ওই দুইজন শ্রীলঙ্কান জেলেকে রাতে ওই বাসাতে রাখার অনুরোধ জানান।

মহেশখালী থানার ওসি মো. আবদুস সুলতান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "গভীর সমুদ্রে আসার পর মূলত তাদের নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গিয়েছিল। যখন তারা আর ট্রলারটি ঠিক করতে পারেনি তখন সেটি ভাসতে ভাসতে আমাদের এদিকে চলে আসে"।

দোভাষীর মাধ্যমে ওই দুইজন জেলের সাথে কথা বলে ওসি মি. সুলতান জানান, গত জুন মাসের ১৯ তারিখ চারজন শ্রীলঙ্কান জেলে ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে বের হওয়ার পর তাদের নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গিয়েছিল। পরে সেই নৌকাটি বাংলাদেশি একটি ট্রলারের নজরে আসে।

উদ্ধার করা জেলে জিয়াউর রহমানের সাথে শ্রীলঙ্কান দুইজন জেলে

ছবির উৎস, ZIAUR RAHMAN

ছবির ক্যাপশান, উদ্ধার করা জেলে জিয়াউর রহমানের (ছবিতে বাম থেকে দ্বিতীয়) সাথে শ্রীলঙ্কান দুইজন জেলে, তাদের সাথে কক্সবাজারের একটি হোটেলের কর্মকর্তা যিনি শ্রীলঙ্কান নাগরিক

শ্রীলঙ্কায় ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ

ওই দুইজন শ্রীলঙ্কান নাগরিক একদিন ছিলেন বাংলাদেশি জেলে জিয়াউর রহমানের বাড়িতে। তারপর মহেশখালী থানা থেকে মি. রহমানকে ফোন দিয়ে ওই দুইজনকে থানায় নিয়ে আসার জন্য বলা হয়। শনিবার তাদের দুইজনকে মহেশখালী থানায় নিয়ে যান মি. রহমান।

পুলিশ জানায়, ওই দুইজন জেলে তাদের নিজ দেশের ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা বুঝেনও না এবং বলতেও পারেন না।

একটা পর্যায়ে পুলিশ কক্সবাজারের একটি হোটেলের দায়িত্বে থাকা একজন শ্রীলঙ্কান নাগরিককে ফোন দিয়ে তাদের থানায় নিয়ে আসেন। যিনি দোভাষী হিসেবে পুরো ঘটনাটি তার কাছ থেকে শোনেন এবং সেটি পুলিশকে ব্যাখ্যা করেন।

একটা পর্যায়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানায় বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কান দূতাবাসকে।

মহেশখালী থানার ওসি মো. আবদুস সুলতান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "খবর পেয়ে শ্রীলঙ্কার অ্যাম্বাসেডর আমাকে ফোন দেন। আমার সাথে কথা বলার পর আমাদের হেফাজতে থাকা ওই দুইজন জেলের সাথে কথা বলেন এবং তাদেরকে আশ্বস্ত করেন যে তাদের দেশে ফিরিয়ে নিবেন"।

পুলিশ জানায়, ওই দুইজনকে নাগরিককে থানা হেফাজত থেকে সমাজ সেবা অধিদপ্তরে রাখার জন্য আদালতের মাধ্যমে আবেদন করা হয়েছে। দুয়েকদিনের মধ্যে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে তাদেরকে ঢাকায় পাঠানো হবে।

ওসি মি. সুলতান বলছিলেন, "আমাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় ওই দুজন জেলের পাসপোর্ট ছবি তুলে আমরা শ্রীলঙ্কান অ্যাম্বাসিতে পাঠিয়েছি। এরপর তাদের নামে পাসপোর্ট কিংবা পাস ইস্যু হবে। ট্রাভেল পাশসহ যাবতীয় কার্যক্রম শেষ হলেই তাদের নিজ দেশে ফেরানো কার্যক্রমটি সম্পন্ন হতে পারে"।

যে নৌকা ছেড়ে যেতে চাননি শ্রীলঙ্কান ওই দুই নাগরিক শেষ পর্যন্ত সেই নৌকাটি আর তার দেশে পাঠানো সম্ভব হবে না বলে জানায় পুলিশ।

পুলিশের পক্ষ থেকে তাদেরকে সেই বিষয়টি জানানোর পর বাবা ছেলে ওই দুই জেলে জানিয়েছেন তাদের মাছ ধরার সেই নৌকাটি তার বাংলাদেশি জেলে জিয়াউর রহমানকে উপহার দিয়ে যেতে চান।

মি. সুলতান বলেন, "ওরা (শ্রীলঙ্কান দুইজন জেলে) আমাকে বলছে যে আমাদেরকে উদ্ধার করেছে তাকে আমাদের নৌকাটি গিফট করে দিবো। তবে, আমরা এই নৌকাটি আপাতত জব্দ তালিকায় যুক্ত করে আদালতে উপস্থাপন করেছি"।

তিনি জানান, ওই নৌকাটি এখন যদি বাংলাদেশি জেলে তাদের কাছ থেকে গিফট হিসেবে নিতে চান তাহলে সেটি আদালতের মাধ্যমে সব প্রক্রিয়া শেষ করে নিতে পারেন। তবে আদালতের সব প্রক্রিয়া শেষ করেই করতে হবে।

বাংলাদেশি জেলে জিয়াউর রহমান অবশ্য সেই আগ্রহও দেখিয়েছেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "তাদের জন্য নিঃস্বার্থ উপকার করেছি। তারা যদি ভালবেসে নৌকাটি দিতে চান আমি সেটি নেবো"।