বিদ্যুতের মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে প্রশ্ন-আপত্তি কেন?

- Author, আবুল কালাম আজাদ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বিদ্যুতের বিল নিয়ে সম্প্রতি গ্রাহকদের বড় ধরনের অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। জুন মাসে নতুন দাম নির্ধারণের পর শহর-গ্রাম নির্বিশেষে প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের অনেকেই ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করছেন।
বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে অতিরিক্ত মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জের নামে যে টাকা আদায় করা হচ্ছে সেটি নিয়েও আপত্তি ও প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা।
বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সাতটি স্ল্যাব রয়েছে। যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে তার উপর স্ল্যাব অনুযায়ী নির্দিষ্ট রেটে বিদ্যুতের বিল হবে।
বিদ্যুতের নতুন মূল্য অনুযায়ী ৪০০ ইউনিটের পর থেকে প্রতি ইউনিটের মূল্য ১৫.০১ টাকা। আর ৬০০ ইউনিটের বেশি খরচ করলে পরবর্তী প্রতি ইউনিট ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা দরে গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয়। এই বিলের সঙ্গে যুক্ত হয় ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট।
একটি বিদ্যুৎ বিল যখন গ্রাহকের কাছে আসছে সেখানে কত ইউনিট ব্যবহার হচ্ছে সেই হিসাব উল্লেখ থাকে। এছাড়া গ্রাহকের লোড অনুযায়ী কিলোওয়াট প্রতি ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ।
মিটার কেনা না থাকলে তার ভাড়াও যোগ হচ্ছে। এছাড়া পূর্ববর্তী মাসের বকেয়া থাকলে সেই বিল এবং তার সাথে বিলম্ব মাশুলও থাকছে নতুন বিলে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট, বিলম্ব মাশুল এবং প্রযোজ্য হলে প্রিপেইড মিটার ভাড়া বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে যুক্ত হয়।
পোস্টপেইড বিলে এসব চার্জ উল্লেখ করে বিল গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করে বিতরণ সংস্থাগুলো। আর প্রিপেইড মিটার হলে টাকা ঢোকানোর সময় বিভিন্ন চার্জ কেটে তারপর বাকি টাকা বিদ্যুতের দাম হিসেবে মিটারে প্রদর্শন করা হয়।
বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও শুধু কানেকশন থাকলেই প্রতিমাসে ডিমান্ড চার্জ এবং মিটার ভাড়া গুনতে হয় গ্রাহকদের।
ডিমান্ড চার্জ
বিদ্যুৎ খাতে ডিমান্ড চার্জ হলো অবকাঠামো, ট্রান্সফরমার, বিতরণ লাইন ও সংযোগ প্রস্তুত রাখার জন্য নির্ধারিত ফি।
অন্যদিকে মিটার ভাড়া নেওয়া হয় মিটার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ।
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এই চার্জ নির্ধারণ করে দেয়। বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট লোডের জন্য ডিমান্ড চার্জ হয় ৪২ টাকা।
এই হিসেবে এখন যেসব গৃহস্থলিতে দুই কিলোওয়াট ডিমান্ড তাদের বিদ্যুৎ বিলে অতিরিক্ত আসছে ৮৪ টাকা। যেসব বাড়িতে লোড ১০ কিলোয়াট সেখানে প্রতিমাসে ৪২০ টাকা ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়।
এই ডিমান্ড চার্জ নিয়েও গ্রাহকদের কেউ কেউ ভুক্তভোগী হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। কারণ বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার সময় কেউ প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোড নিয়ে থাকলে সেই অনুযায়ী অতিরিক্ত চার্জ দিতে হচ্ছে প্রতি মাসে।

একজন ভুক্তভোগী বলেন, তিনি কারিগরি বিষয়টি বুঝতে পারেননি, তাই ১৫ ওয়াট লোডের বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছেন। এখন প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিলে অতিরিক্ত ৬৩০ টাকা শুধু ডিমান্ড চার্জই দিতে হচ্ছে।
এই ডিমান্ড চার্জের সঙ্গে যদি মিটার ভাড়া থাকে, তাহলে থ্রি-ফেজ লাইন লাগবে। এর জন্য মিটার ভাড়া হবে আড়াইশ টাকা। অর্থাৎ প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিলে ১৫ ওয়াট লোডের গ্রাহককে অতিরিক্ত ৮৮০ টাকা পর্যন্ত বিল গুনতে হতে পারে।
মিটার ভাড়া
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিল আহরণে উন্নত প্রযুক্তি এবং বকেয়া সমস্যা দূর করা এবং রাজস্ব আহরণকে গতিশীল করতে প্রিপেইড মিটার স্থাপন করার উদ্যোগ নেয় সরকার।
বর্তমানে দেশে বিতরণ সংস্থাগুলোয় প্রিপেইড মিটার রয়েছে। নতুন সংযোগ এবং মিটার নষ্ট হলে নতুন মিটার স্থাপনের সময় গ্রাহককে বাধ্যতামূলক প্রিপেইড মিটার দেওয়ার নিয়ম করা হয়েছিল।
বিতরণ সংস্থার হিসেবে, সিঙ্গেল ফেজ প্রিপেইড মিটারের দাম ধরা হয়েছে ছয় হাজার টাকা। একটি প্রিপেইড মিটারের আয়ুষ্কাল ১০ বছর মেয়াদ ধরে ১২০ মাসের ভাড়া গ্রাহকের কাছ থেকে মাসে ৪০ টাকা করে আদায় করা হয়।
অন্যদিকে থ্রি ফেজ ২৫ হাজার টাকা হিসেবে করে এর ভাড়া প্রতিমাসে ২৫০ টাকা। ১০ বছরের মধ্যে মিটার নষ্ট হলে বিতরণ সংস্থাই নতুন মিটার লাগিয়ে দেবে বিনা পয়সায়।
প্রিপেইড মিটারে বিল লোড করার পর মিটার ভাড়া এবং ডিমান্ড চার্জ সেই সঙ্গে এনার্জি বিলের উপর পাঁচ শতাংশ ভ্যাট আগেই কেটে ফেলা হয়।
এরপর যে টাকা থাকে সেই টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারেন গ্রাহক। যে কারণে ভোক্তারা অনেকেই বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেই টাকা কাটার বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্ত হন।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

বর্তমানে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে এই মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট কাটার কারণে অনেকের আপত্তি করছেন। অগ্রিম বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার পরেও লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি গ্রাহকদের আরো অসন্তুষ্ট করতে তুলেছে।
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার একজন গ্রাহকের প্রশ্ন, এই মিটার ভাড়া এবং ডিমান্ড চার্জ কীসের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে এবং কতদিন ধরে চলবে এটা স্পষ্ট নয় তাদের কাছে।
"কারেন্ট পাই না। টাকা খালি বাড়ে আর বাড়ে দিনে দিনে। যদি মিটারে এরকম চাপটা পড়ে তাহলে গরিবের জন্য সমস্যা না। ৫০০ টাকা ভরলে দেড়শ করে কাইট্যা নিতাছে। সাড়ে তিনশ টাকা টিকে," বলেন ফরাজিকান্দা গ্রামের একজন নারী গ্রাহক।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিতরণ সংস্থাগুলো মনে করছে প্রিপেইড মিটারে গেলে বিল নিয়ে ভোগান্তি কমবে। কিন্তু নতুন করে প্রিপেইড মিটার বসাতে গিয়ে অনেক জায়গায় বাধার মুখে পড়ছে বিতরণ সংস্থা।
প্রিপেইড মিটার ব্যবহারে অগ্রিম টাকা কেটে নেওয়া, বিল বৃদ্ধি, নানা জটিলতার আশঙ্কা থেকে প্রিপেইড মিটার বিরোধী জনমত গড়ে উঠছে বিভিন্ন জেলায়। নারায়ণগঞ্জে গণ-অনশন, সভা-সমাবেশ হয়েছে। গঠিত হয়েছে নাগরিক অধিকার ফোরাম।
প্রিপেইড মিটার বিরোধী জনমত এবং আন্দোলনে সক্রিয় আছেন এ ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান মাসুম। তিনি বলেন, গ্রাহকরা অগ্রিম টাকা দিতে রাজি নয়। এর জন্য গণশুনানি করে জনগণকে বোঝানো দরকার ছিল সেটিও হয়নি।
"নানা জটিলতার কারণে আমরা এটা গ্রহণ করতে চাচ্ছি না। এই ব্যাপারে আমরা জাতীয় পর্যায়ে ৩০টা জেলার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। এসব জেলায় আন্দোলন চলছে এবং গ্রাহক অধিকার রক্ষা জাতীয় কমিটি করা হয়েছে।"
নারায়ণগঞ্জে মিটার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, ডিমান্ড চার্জ এবং মিটার ভাড়া আদায় নিয়ে ভোক্তাদের প্রশ্ন ও আপত্তি তোলা যৌক্তিক।
মিটার একটা উন্নততর প্রযুক্তি এটাকে গ্রাহকের সুযোগ হিসেবে নেওয়ার কথা এবং এটাকে মানুষ সেবা হিসেবে মনে করছে না। যেটাকে দুর্ভোগ হিসেবে মনে করছে। বাড়তি পয়সা আদায়ের অযুহাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটা বিইআরসি বিচারিক পর্যায়ে নিষ্পত্তি করা দরকার।
"মিটার ভাড়া বিতরণ চার্জের সঙ্গে সমন্বয় হতে হবে। মিটার আলাদাভাবে ভাড়া আদায় করার কোনো সুযোগ নাই। জনগণের কাছ থেকে ডিমান্ড চার্জের নামে বাড়তি অর্থ আদায় এটা একধরনের লুটপাটে পরিণত হয়েছে। ডিমান্ড চার্জের রিভিউ হওয়া দরকার।"
শামসুল আলম বলেন, যেহেতু ডিমান্ড অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে পারে না, সুতরাং ডিমান্ড চার্জ নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলেছে। তার কথায় ডিমান্ড অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে তার অতিরিক্ত খরচটা কী হচ্ছে সেটাতো বিতরণ ইউটিলিটিগুলোকে পরিষ্কার করতে হবে।
"যদি ধরেন আরইবির এক টাকা ৪৩ পয়সা যদি তার বিতরণ চার্জ হয় তাহলে তার বিতরণ ট্যারিফ হয়ে গেল। তাহলে বাইরে যেটা নেওয়া হলো, মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জের জন্য তার কী খরচ হচ্ছে। যে চার্জ নিচ্ছে কী কারণে, কী খরচ হচ্ছে এটার এটার বৈধতা নিয়ে, ন্যায্যতা নিয়ে এটার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তারপরে আবার ডিমান্ড অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে না।"

এ ব্যাপারে বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ডিমান্ড চার্জ চব্বিশ ঘণ্টার হিসেবে সারামাস জুড়ে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য পুরো মাসের জন্য দিচ্ছি। অথচ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি কম। এখন গ্রাহক যদি বলে কেন ভাই, আমাকে বিদ্যুৎ দিচ্ছ কম তাহলে ডিমান্ড চার্জ এত নিবা কেন- সেটা তাহলে একট অনাস্থা তৈরি করে, অস্বস্তি-ক্ষোভ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে প্রবলেমটা হচ্ছে।"
বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের আন্দোলন ভাবনার বিষয়। মানুষের আস্থায় কেন ঘাটতি হচ্ছে সেটি স্পষ্ট করে জনগণকে বোঝাতে হবে।
"গ্রাহকদের যে ক্ষোভ হচ্ছে এগুলো আসলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো বডিকে দিয়ে অডিট করা, চেক করা, ভেরিফাই করা এই কাজগুলো করানো হলে গ্রাহকদের আস্থা অনেকখানি ফিরবে। আর পয়লা কথা হচ্ছে বিদ্যুৎটা আপনাকে দিতে হবে," বলে মি. চৌধুরী।
বিতরণ সংস্থার পক্ষে বলা হচ্ছে সরকারের পরিকল্পনা বিদ্যুৎ গ্রাহকদের মধ্যে ৮০ শতাংশ প্রিপেইড মিটার প্রতিস্থাপন করা।
ডিপিডিসির প্রকল্প পরিচালক মো. হানিফ উদ্দিন বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে জনগণকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিলে পোস্টপেইড থেকে প্রিপেইড মিটারে গেলে স্বচ্ছতা তৈরি হবে। এখানে প্রিপেইড মিটারে বাড়তি কোনো টাকা কাটা হয় না, পোস্ট পেইডের মতো একই হারে ভ্যাট এবং ডিমান্ড চার্জ কাটা হয়।
গ্রাহক যদি এককালীন মিটার কিনে না দেয় সেক্ষেত্রে ভাড়া নেওয়া হয়। এছাড়া প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকরা এখন ০.৫ শতাংশ হারে বিদ্যুৎ বিলে বিলে রিবেট বা ছাড় পান, জানান তিনি।
বিদ্যুতের মিটার, বিভিন্ন চার্জের যৌক্তিকতা নিয়ে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে আরো তৎপর হতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে বিইআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাচাই বাছাই করে ডিমান্ড চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সবশেষ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি হলেও ডিমান্ড চার্জ বাড়ানো হয়নি।
তারা এটাও জানিয়েছে, প্রিপেইড মিটার নিয়ে সরকার গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি যাচাই করে কোনো সমস্যা পায়নি, তবে প্রিপেইড মিটার ভাড়ার বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।




