ইশরাক হোসেনের প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে নানা প্রশ্ন

ছবির উৎস, Ishraque Hossain/Facebook
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের ধাওয়া করার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কেউ কেউ বিষয়টিকে সমর্থন করে লিখেছেন যে, মি. হোসেন কোন নিরীহ ব্যক্তির ওপর অস্ত্র ধরেননি বরং মাদকবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন।
আবার অনেকেই ওই অস্ত্রটি বৈধ নাকি অবৈধ, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
একইসঙ্গে, প্রকাশ্যে একজন জনপ্রতিনিধির পিস্তল তাক করে দৌড়ানোর সমালোচনাও করেছেন কেউ কেউ।
মি. হোসেনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শনিবারই পুরো ঘটনার একটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছিল। ওই ভিডিওতে হাতের অস্ত্র ব্লার করে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পরে রাতে আর মি. হোসেনের হাতে অস্ত্রসহ ওই ভিডিওটি তার ফেসবুক পেজে পাওয়া যায়নি। সেটি ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে।
তবে, মাদক কারবারীদের আটক অভিযানের ঘটনার নানা ছবি-ভিডিও রয়েছে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে।
যদিও ইশরাক হোসেন দাবি করেছেন, ওই অভিযানে তিনি আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, একজন জনপ্রতিনিধি বা আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে এমন কার্যক্রম চালাতে পারেন? আইন কী বলে?
মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের নাকি সংসদ সদস্যের?
এসব প্রশ্নে আলোচনায় আইনজ্ঞদের অনেকে বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা মাদক প্রতিরোধে একজন প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের এই ধরনের পদক্ষেপ মোটেও আইনসঙ্গত নয়।
এই ধরনের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
এদিকে, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

ছবির উৎস, Ishraque Hossain/Facebook
ইশরাক হোসেনের অস্ত্র বৈধ?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। পুরোনো ঢাকার এই আসনের গেন্ডারিয়া থানার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের রেললাইনের পাশের একটি মাঠের কোণায় পলিথিনের ছাউনির ঘরে শনিবার মাদকবিরোধী অভিযান চালান মি. হোসেন।
সে সময় তার হাতে পিস্তল প্রদর্শনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
রোববার সকালে এই ঘটনা এবং অস্ত্রের বিষয়ে কথা বলতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে রিসিভ করেননি। পরে একটি মেসেজে জানান, গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিং এ যাচ্ছেন এবং ফ্রি হয়ে কল করার কথা জানান।
যদিও বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত তিনি আর ফোন ব্যাক করেননি বা আবার কল করলেও রিসিভ করেননি।
তবে, নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ইশরাক হোসেন দুপুর একটায় এই ঘটনা সম্পর্কে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। এই ফেসবুক পোস্টে বিবৃতির বার্তাপ্রেরক হিসেবে নাম রয়েছে তার প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তার।
বিবৃতিতে ইশরাক হোসেন নিজের ব্যবহৃত অস্ত্রটি লাইসেন্সকৃত বলে দাবি করেছেন।
একইসঙ্গে, আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র প্রদর্শনের সুনির্দিষ্ট কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
মি. হোসেন কেন সেখানে মাদক অভিযানে গিয়েছেন, সে সম্পর্কে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "সর্বশেষ পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী-সাধারণ নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই তিনি গতকাল উক্ত এলাকায় যান।"
শনিবার ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিজস্ব গোয়েন্দা সূত্রে মি. হোসেনের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং মাদক কারবারিরা ছাদ থেকে আকস্মিক গুলিবর্ষণ করতে পারে, এমন আশঙ্কার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রী বলেন, "কর্মসূচি চলাকালে একটি অস্থায়ী আস্তানার নিকট পৌঁছালে ৩০ থেকে ৩৫ জন আইনলঙ্ঘনকারী ব্যক্তি অতর্কিতে হইচই করে আমাদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে ধেয়ে আসে।"
"এমতাবস্থায় সুনির্দিষ্ট হামলার আশঙ্কা এবং জানমালের নিরাপত্তায় আমি এবং আমার সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা গাড়ি থেকে নেমে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরি" বলেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
একইসঙ্গে, মি. হোসেনের হাতে থাকা পিস্তল বা আগ্নেয়াস্ত্রটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বলেও দাবি করা হয়েছে ওই বিবৃতিতে।
"সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নস্যাৎ হওয়ার পরপরই অস্ত্রটি যথাস্থানে রাখা হয়। উক্ত আগ্নেয়াস্ত্রটি যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং এর প্রদর্শনী কেবলই আত্মরক্ষার স্বার্থে আইনি কাঠামোর মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।"
এছাড়া, পুলিশের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও সহায়তায় সন্দেহভাজন আস্তানাগুলোতে যৌথ অভিযান পরিচালিত হয় বলেও দাবি করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
ছয়জন মাদক কারবারিকে আটক করে জব্দ করা আলামতসহ গেন্ডারিয়া থানার পুলিশের কাছে সোপর্দ করার কথা মি. হোসেনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
যদিও গেন্ডারিয়া থানার ওসি মনিরুজ্জামান খান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তাদেরকে পরে জানানো হলে সেখানে গিয়েছিলো পুলিশ।
এদিকে, বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যম এই ঘটনাকে বিকৃত করে সংবাদ পরিবেশন করেছে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মি. হোসেন।
একইসঙ্গে, মাদক নির্মূলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে, ভবিষ্যতেও এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে সংবাদ বিবৃতিতে জানিয়েছেন তিনি।

ছবির উৎস, Ishraque Hossain/Facebook
মাদক নিয়ন্ত্রণ কার কাজ?
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, গেন্ডারিয়ার যে স্থানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন মাদক নিয়ন্ত্রণে অভিযান পরিচালনা করেছেন, সেই স্থানে তারাই নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।
গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান খান দাবি করেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালনা করে ও গ্রেফতার করে থাকে।
"আমরা ওই জায়গা থেকে... প্রত্যেক মাসে আট-দশটা অভিযান করি। প্রায় এক-দেড়শো, দুইশো গ্রেফতার হয়। এখন নিয়ন্ত্রণ বলতে হান্ড্রেড পারসেন্ট না হলেও আমাদের কার্যক্রম তো সফলতা আছে" দাবি করেন মি. খান।
তবে, গেন্ডারিয়ার ওই স্থানে মাদক অভিযানে যাওয়ার আগে পুলিশকে জানানো হয়নি বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
প্রতিমন্ত্রী মি. হোসেন সেখানে গিয়ে অভিযান পরিচালনা ও কয়েকজনকে আটক করার পর পুলিশকে খবর দেয়া হয়। পরে তারা সেখানে পৌঁছে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার এমন এক প্রশ্নে পুলিশ কর্মকর্তা মি. খান জানান, গত ১১ই অক্টোবর ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে প্রায় সাড়ে তিনশো পুলিশ ওই স্থানটিতে 'রেইড' দিয়েছিল।
সেসময় প্রায় পঞ্চাশজনকে গ্রেফতার করার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, তারা কারাগারে রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে।
এদিকে, রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
"এখনই এটা মূল্যায়নের সময় আসেনি। আপনারা যেটা দেখেছেন আমিও দেখেছি। এটা লোকাল থানার ডিসিকে বলা হয়েছে, উনি স্থানীয়ভাবে টোটাল ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করে পর্যালোচনা করে একটা রিপোর্ট দিবেন" বলেন মি. ইসলাম।
আইনের লঙ্ঘন হলে পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
"যদি কোন আইনের ব্যত্যয় হয়ে থাকে তবে অবশ্যই ডিএমপি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে" বলেন ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা মাদক নিয়ন্ত্রণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ।
"মাদক এবং অপরাধের বিষয়ে আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। এখানে প্রতিমন্ত্রীও উদ্বিগ্ন। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা মাদক প্রতিরোধে এই ধরনের পদক্ষেপ মোটেও আইনসঙ্গত নয়। উনি তার মন্ত্রণালয়ের যে দায়িত্বের সীমারেখা সেটাও নিঃসন্দেহে লঙ্ঘন করেছেন" বলেন মি. মালিক।
অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়ে আইনে যা আছে
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের ১৩ই জুলাই আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালাটি প্রকাশ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি স্বীয় লাইসেন্সে অন্তর্ভূক্ত অস্ত্র আত্মরক্ষার নিমিত্তে নিজে বহন বা ব্যবহার করতে পারবেন।
তবে অন্যের ভীতি বা বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে, এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।
আগ্নেয়াস্ত্র বহন নীতিমালায় আরো বলা হয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান অথবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের গার্ড ইউনিফর্ম ছাড়া প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করতে পারবে না।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, "যদি তিনি আক্রান্ত হতেন তাহলে আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র ব্যবহারের একটা বিধান আছে। তো, এইরকম কোন ঘটনা, তার ওপর আক্রমণ হয়েছে, এইরকম কিছুতো ভিডিও থেকে প্রতীয়মান হয় না।"
ঘটনাস্থলে শিশু ছিল বলে ভিডিওতে দেখা গেছে উল্লেখ করলে এটি অস্ত্র ব্যবহার নীতিমালার লঙ্ঘন বলে জানান তিনি।
"গান(অস্ত্র) লাইসেন্স দেয়া হয় তার যদি জীবনের প্রতি কোনো হুমকি থাকে বা নিজেকে আত্মরক্ষার জন্য। অন্যদের হুমকি-ধামকি দেওয়া, এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এটাতো গান লাইসেন্সের কোন শর্তের মধ্যেই পড়ে না" বলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
এ ধরনের কার্যকলাপে ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বলেও উল্লেখ করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী।









