আলোচনার সুযোগ তৈরি করতেই ইরানে হামলা স্থগিত করেছেন ট্রাম্প, দাবি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের

মার্কিন নৌ অবরোধ

ছবির উৎস, CENTCOM/X

ছবির ক্যাপশান, মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার শঙ্কা থেকে ইরানের ওপর হামলা বন্ধের আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে পুনরায় শান্তি আলোচনা শুরুর একটা সুযোগ তৈরি করতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আপাতত হামলা স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ।

গত রোববার মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত ওয়াল্টজ বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কূটনীতিকে আরেকটা সুযোগ দিচ্ছেন, যাতে শান্তি আলোচনাকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায়।

এমন একটি সময় তিনি এমন মন্তব্য করলেন যখন মার্কিন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে আসার কারণ ইরানের ওপর হামলা বন্ধের আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প।

এদিকে, মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকে টানা দুই রাত হামলা না চালানোয় ইরানও 'প্রতিশোধমূলক' পাল্টা হামলা স্থগিত রেখেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া।

রোববার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, চলমান যুদ্ধে ইরান আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে কেবল 'হামলার জবাবে পাল্টা হামলা' চালানোর সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।

"যুক্তরাষ্ট্র গত দুই রাতে যেহেতু হামলা বন্ধ রেখেছে, সেজন্য আমরা আমাদের সামরিক অভিযান স্থগিত রেখেছি," বলেন জেনারেল আকরামিনিয়া।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেটি টানা প্রায় চল্লিশ দিন চলে। এরপর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা শুরু করে ওয়াশিংটন ও তেহরান।

দফায় দফায় বৈঠকের এক পর্যায়ে গত জুন মাসে দু'পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সপ্তাহ দুয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়।

এর মধ্যে গত সপ্তাহে হামলা আরও তীব্র করার ইঙ্গিত দেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাতে সম্প্রতি বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশ করে মার্কিন গণমাধ্যম এক্সিওস।

মাইক ওয়াল্টজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মাইক ওয়াল্টজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আইআরজিসি'র ড্রোন হামলায় মার্কিন সেনা হতাহতের ঘটনাও ঘটে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত শুক্রবার অনেকটা আকস্মিকভাবেই ইরানের ওপর হামলা বন্ধের সিদ্ধান্ত জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি কি আপাতত যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মি. ওয়াল্টজ আরেকটি মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসিকে বলেছেন, "আমি মোটেও অত দূরে যাব না। প্রেসিডেন্ট সব বিকল্পই খোলা রাখছেন।"

এদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে আপাতত ইরানের ওপর সামরিক হামলা বৃদ্ধি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটির পেছনের কারণ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসা।

খবরটিতে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে, ইরানের ওপর হামলা আরও বৃদ্ধি করা হলে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ 'বিপজ্জনক পর্যায়ে' নেমে আসতে পারে।

এছাড়া পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরান যেভাবে ড্রোন হামলা অব্যাহত চালাচ্ছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলার শঙ্কাও তৈরি হয়েছিল বলে মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে সার্বিক বিবেচনায় ট্রাম্প হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টা-পাল্টি নৌ-অবরোধে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি নৌ-অবরোধে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে

তবে মার্কিন গণমাধ্যমের এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ।

"এই অভিযানটি যতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন, সেটার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে মজুদ আছে," বলেন মি. ওয়াল্টজ।

যদিও রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে এর আগে নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবি তিনি পোস্ট করেন, যেখানে মার্কিন সামরিক বিমানকে ইরানি জাহাজ এবং খার্গ দ্বীপে বোমা ফেলতে দেখা যায়।

অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করতে গত শুক্রবার ও শনিবার তেহরানে ইরান এবং ওমানের মধ্যে বেশ কয়েক দফায় 'কারিগরি বৈঠক' হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির নিয়ন্ত্রণই মূলত এখন স্থায়ীভাবে যুদ্ধ শেষ করার পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম দফায় চল্লিশ দিনের যুদ্ধ শেষে শান্তি আলোচনায় বসলেও যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান- কেউই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি হয়নি।

তাদের পাল্টাপাল্টি নৌ-অবরোধে জলপথটি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে।

পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে উভয়পক্ষ নৌ অবরোধ তুলে নিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করতে সম্মত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ট্রাম্প বলছেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে তিনি কূটনীতিকে আরেকটা সুযোগ দিতে চান

এ লক্ষ্যে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা একটি সমঝোতা স্মারক সই করেন, যেখানে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে বিভিন্ন দেশের তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর ইরানি বাহিনীর হামলা চালানোকে কেন্দ্র করে গত ১৩ই জুলাই মার্কিন বাহিনী আবারও বিমান হামলা শুরু করে। সেইসঙ্গে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করেন ট্রাম্প।

জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাতে থাকে।

এসব হামলায় অন্তত চারজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দ্বিতীয় দফা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন হামলায় তাদের দেশে কয়েক ডজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহতও হয়েছেন অনেকে।

এখন উভয়পক্ষ হামলা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কূটনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদিও যুদ্ধ অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা নেই বলে মনে করছে ইরান।

যুদ্ধবিরতি পুনরায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ইরানের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, "যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। তাদের কোনো সুস্পষ্ট কৌশল নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে এবং সেন্টকমের কর্মকাণ্ডে এটি প্রতিফলিত হয়।"