'বদির মেটিকুলাস ডিজাইনেই একরাম হত্যা', বললেন চিফ প্রসিকিউটর

মো. একরামুল হক, টেকনাফের সাবেক পৌর কাউন্সিলর, টেকনাফ
ছবির ক্যাপশান, কথিত বন্দুকযুদ্ধে একরামুল হক নিহত হওয়ার ঘটনার জেরে বাংলাদেশি সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার টেকনাফের সাবেক পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

অন্য যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা হলেন- আসাদুজ্জামান কামাল, ওবায়দুল কাদের, বদিউর রহমান বদি, র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ, কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত আনোয়ার লতিফ খান তুষার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম মিনু, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, মেজর অবসরপ্রাপ্ত রুহুল আমিন ওরফে রাজন, স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস মাহমুদ ওরফে রাজু এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশিকুর রহমান ওরফে সৈকত।

তাদের মধ্যে আবদুর রহমান বদি, আনোয়ার লতিফ খান ও মাহাবুব আলম অন্য মামলায় বর্তমানে আটক রয়েছেন।

শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তদের আটজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং গ্রেফতার থাকা তিন আসামিকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, একরাম হতাকাণ্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তা রিপোর্ট দিয়েছেন।

"সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছেন। যারা আটক আছে তাদের শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে। আর যারা পলাতক তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আগামী ২৫শে অগাস্ট শুনানির দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল," বলেছেন মি.ইসলাম।

তিনি বলেন, "বদিউর রহমান বদির মেটিকুলাস ডিজাইনেই এ ঘটনা ঘটেছিল। একরাম ছিল তার প্রতিপক্ষ। একরামকে হত্যার পর তার সম্পত্তি এই বদি বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করেছিল। নেপথ্য নায়ক ছিল বদি"।

২০১৮ সালের জুনে সংবাদ সম্মেলনে অডিও প্রকাশ করেছিলেন একরামুল হকের স্ত্রী
ছবির ক্যাপশান, ২০১৮ সালের জুনে সংবাদ সম্মেলনে অডিও প্রকাশ করেছিলেন একরামুল হকের স্ত্রী

প্রসঙ্গত, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যখন র‍্যাব ও এর সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল তখনো তাদের বিবৃতিতে একরাম হত্যার প্রসঙ্গ এসেছিল।

ওই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছিলেন তখন র‍্যাবের দায়িত্বে থাকা বেনজির আহমেদ ও বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ।

বেনজির আহমেদ সম্প্রতি দুবাইতে আটক হয়েছেন বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগেই মি. আহমদ দেশ ছেড়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আরও বলেছেন, ''তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার তাদের মতের বিরুদ্ধে গেলেই টার্গেট করে অপহরণ করতো। কাউকে আয়নাঘরে বা কাউকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হতো।''

"এমনই একটি ঘটনা একরাম হত্যা। মোবাইল সুইচ অন থাকা অবস্থায় তার স্ত্রী ও মেয়েরা ফায়ারিং আওয়াজ ও কথোপকথন শুনতে পেরেছিল। এ সব কিছু আমরা আলামত হিসেবে নিয়েছি। প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যসহ বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে সুপ্রিরিয়র রেসপনসিবিলিটি হিসেবে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান কামাল,ওবায়েদুল কাদের ও বদিউর রহমান বদির নাম এসেছে," বলেছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

র‍্যাবের এক কথিত মাদক বিরোধী অভিযানে ২০১৮ সালের ২৬শে মে একরামুল হক কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে নোয়াখালিয়া পাড়ায় নিহত হয়েছিলেন।

তিনি টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন এবং প্রায় এক যুগ তিনি ছিলেন টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি।

তখন কথিত বন্দুকযুদ্ধে তার নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে রেকর্ড করা একটি অডিও প্রকাশ হওয়ার পর ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।

ওই অডিও রেকর্ড পরিবারের পক্ষ থেকে কক্সবাজারে এক সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের শোনানো হয়েছিল।

মি. হকের স্ত্রী আয়শা বেগম তখন বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেছিলেন যে তাঁর স্বামীকে ডিজিএফআই এবং র‍্যাবের স্থানীয় দু'জন কর্মকর্তা ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে।

কক্সবাজারে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি যে অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেছিলেন তাতে মি. হকের সাথে তার মেয়ের কথোপকথন শোনা গিয়েছিল।

ওই কথোপকথনের এক পর্যায়ে মি. হকের কন্যাকে বলতে শোনা গিয়েছিল যে, "আব্বু তুমি কান্না করতেছো যে...."। এরপরেই গুলি ও গোঙানির শব্দও শোনা গিয়েছিল। পরে এই অডিও রেকর্ড ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।

শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে একরাম হত্যা মামলায়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে একরাম হত্যা মামলায়

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তদন্ত সংস্থার হাতে আসা অডিও রেকর্ডে কিছু অফিসারের কণ্ঠ তারা প্রযুক্তিগতভাবে শনাক্ত করতে পেরেছেন।

"তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পেরেছি। পাশাপাশি ওই টিমে কারা কারা ছিল, যারা অংশগ্রহণ করেছে তারাও। ইতোমধ্যেও একজন সাক্ষ্য দিয়েছেন যিনি ওই অপারেশনে ছিলেন। তিনি ওই গাড়িতে ছিলেন। যারা এই অপারেশনে সম্পৃক্ত ছিল তাদের সবার নাম এসেছে," বলছিলেন তিনি।

পরে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে এ ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০-১২ জনকে আসামি করে মামলা করেছিলেন একরামুল হকের স্ত্রী আয়শা বেগম।

তিনি তখন সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন যে, তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির প্রত্যক্ষ ইন্ধনে তখনকার র‍্যাব ও ডিজিএফআইয়ের সদস্যরা তার স্বামীকে ডেকে নিয়ে খুন করেছেন। মি. বদি আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ছিলেন।

এ মামলার পর আগে থেকেই অন্য একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় আটক থাকা মি. বদিকে এই মামলাতেও ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ট্রাইব্যুনালে গ্রেফতার দেখানো হয়।