আওয়ামী লীগের বিচার কিভাবে করতে চাইছে সরকার

- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে 'দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার' করা হবে বলে জানিয়েছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে।
'জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি' এবং 'আমরা জুলাই যোদ্ধা' আয়োজিত 'জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬'-এ তিনি বলেছেন, "সন্ত্রাস বিরোধী আইনে আছে, আইসিটি অ্যাক্টে আছে রাজনৈতিক দলের বিচার করা যাবে। সুতরাং অপেক্ষা করুন"।
মি. আহমদের শনিবার দেওয়া এ ঘোষণা নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যেই আজ রোববার ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, আইনে বিচারের সুযোগ আছে, তবে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার হবে কি-না সে বিষয়ে তদন্ত সংস্থা কাজ করছে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গটি সামনে এনেছিলেন তখনকার প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্যসহ আওয়ামী লীগ বিরোধী কিছু রাজনৈতিক দল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই ২০২৫ সালের ১২ই মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তবে তাতে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের জন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা ছিল না।
অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করেছিল। ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে হওয়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশটিতে কিছু সংশোধনী এনে 'সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬' হিসেবে জাতীয় সংসদে পাশ করা হয়েছে।
বিলটি পাশের সময় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, "বিলটি হলো একটি গণত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত সংশোধনী। আগের যে আইন ছিল সেটা সংশোধনের জন্য। ওনারা (জামায়াত) ও এনসিপির বন্ধুরা সবাই মিলে একটা আন্দোলন করেছিলেন। সে প্রেক্ষিতে মোটামুটি একটা জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সে প্রেক্ষিতে তাদের (আওয়ামী লীগ) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনে তাদের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত হয়ে আছে। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইসিটি অ্যাক্টে সংগঠনটির বিচারের জন্য সে আইনও সংশোধন করা হয়েছে"।
এখন তিনি আবার আওয়ামী লীগের বিচারের প্রসঙ্গটি সামনে আনায় সরকার কিভাবে বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হতে চাইছে, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে।

ছবির উৎস, Getty Images
বিচার শুরুর প্রক্রিয়া কতটা এগুলো?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, তদন্ত সংস্থা তদন্ত করছে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত প্রতিবেদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ আছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কিভাবে এই বিচার হতে পারে বা হবে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেছেন, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে যেমন তারা নানা অপরাধ সংঘটন করেছে, ঠিক একই ভাবে ব্যক্তিগত ভাবেও সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির দায় থেকে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তারা করেছে।
"আইন অনুযায়ী এগুলোর বিচার করার ব্যবস্থা আছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট ১৯৭৩, সন্ত্রাস বিরোধী ২০০৯ তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) প্রণয়ন করেছিল। তাদের আইনেই এ জাতীয় অপরাধের বিচার করার ব্যবস্থা আছে," বলেছেন মি. ইসলাম।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রধান একটি লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। অভিযোগটি যথাযথভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে দিয়েছি। তারা সেটা তদন্ত করছে। পাশাপাশি সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ এর অধীনে পুলিশের আলাদা তদন্ত করার সুযোগ আছে"।
তিনি বলেন, সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার হবে কি হবে -না সে বিষয়ে আমাদের সংস্থা তদন্ত করছে।
"যদি তদন্তের পর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া যায়, আমার কাছে রিপোর্ট যদি দাখিল করা হয়- আমি অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে রিপোর্ট প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। এ বিষয়ে আমাদের তদন্ত সংস্থায় তদন্ত চলমান আছে," বলছিলেন মি. ইসলাম।

ছবির উৎস, BBC/TANVEE
কিন্তু প্রক্রিয়া কী হতে পারে
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তাদের রিপোর্ট দিবে চিফ প্রসিকিউটর বরাবর।
"এরপর তারা সেটি পর্যালোচনা করে দেখবেন যে রিপোর্টে অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ আছে কি-না। যদি থাকে তাহলে তারা ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করবেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের অভিযোগ দায়েরের পর আদালত যদি মনে করে এতে পর্যাপ্ত উপাদান রয়েছে তাহলে আদালত সেটি আমলে গ্রহণ করবেন বা বিবেচনায় নিবেন।
"এরপর সব পক্ষ মামলার কপি পাবে। তারপর অভিযোগ গঠনের শুনানি হবে। শুনানি শেষে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে," বলছিলেন শিশির মনির।

ছবির উৎস, Getty Images
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী বলেছেন
আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে এসেছে 'জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি' এবং 'আমরা জুলাই যোদ্ধা' আয়োজিত 'জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬'-এ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তৃতার এক পর্যায়ে বলেন, এই বাংলাদেশ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। জাতিসংঘের রিপোর্টে ১৪শর (নিহত) কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অফিশিয়ালি, বিভিন্ন পত্রিকায় ও জরিপে ৭০০-৮০০ র মতো খতিয়ান পাওয়া যায়।
"কারণ তাদের খতিয়ান হাসপাতালগুলো রক্ষা করতে পারেনি। তাদের দাফন করা হয়েছে বেওয়ারিশ হিসেবে। আজ স্বজনরা কবরের সন্ধান করে আমরা দিতে পারি না। এরকম একটি নৃশংস হত্যার পরে, গণহত্যার পরে আজও পর্যন্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার কোনো রকমের অনুশোচনা নেই," বলেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
আওয়ামী লীগের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা জুলাই যোদ্ধাদের অপরাধী হিসেবে তকমা দিচ্ছে, গণ-অভ্যুত্থানকে জঙ্গি তকমা দিচ্ছে। তাদের অনুশোচনাও নেই, দোষ স্বীকারের ইতিহাসও তাদের নেই।
"আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে। রাজনৈতিক ভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে। দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর রাজনীতি করতে পারবে না।
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা। আপনারা দাবি করেছেন।
তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে। ইনশাল্লাহ খুব শিগগিরই রাজনৈতিক দল হিসেবে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানো যাবে," বলেছেন মি. আহমদ।
সালাহউদ্দিন আহমদ তখন উল্লেখ করেন যে , "সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাস বিরোধী আইনে আছে, আইসিটি অ্যাক্টে আছে রাজনৈতিক দলের বিচার করা যাবে। সুতরাং অপেক্ষা করুন"।
ওই অনুষ্ঠানে তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি মামলার রায় হয়েছে এবং আর ২৭টি বিচারাধীন আছে। "এছাড়া ৭২ মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। এর আগে আবু সাইদের মামলায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। সাজা হয়েছে সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুনের"।








